নির্বাচন সামনে রেখে ভারতীয় মিডিয়ায় তীব্র জামায়াতবিরোধী প্রচারণা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:১৭ পিএম
বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভারতীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে তীব্র ও একপাক্ষিক প্রচারণা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রতিবেদনে দলটির রাজনৈতিক ভূমিকা ও জনসমর্থন উপেক্ষা করে জামায়াতকে আঞ্চলিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির উৎস হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
ফার্স্টপোস্ট, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, আনন্দবাজার পত্রিকা ও রিপাবলিক বাংলাসহ একাধিক ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে নির্বাচন পেছানোর চেষ্টা করছে। বিজেপিপন্থি সংবাদমাধ্যম ফার্স্টপোস্টের সম্পাদক পালকি শর্মা তার বিশ্লেষণে অভিযোগ করেছেন, জনমত জরিপে পিছিয়ে থাকায় জামায়াত এখন নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ নয়—এমন বক্তব্য দিচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের ধারাবাহিকভাবে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বড় জয় পাওয়া বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছে না। বরং এসব অর্জনকে ‘উগ্রবাদী প্রভাব’ বা ‘র্যাডিক্যালাইজেশন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
আনন্দবাজার পত্রিকায় জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্য এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন দলটি আগাম পরাজয় মেনে নিয়ে প্রশাসনকে দায়ী করছে। অথচ জামায়াতের বক্তব্য ছিল—প্রশাসনের ভেতরে পক্ষপাতদুষ্ট শক্তির প্রভাব দূর করে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ বিভাগের এক অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ভেঙে নতুন বাস্তবতা তৈরি করলেও ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী গণমাধ্যম এখনো পুরোনো ‘একাত্তর’ বয়ানেই আটকে আছে। তার মতে, জামায়াতকে এখনো মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার ছকে বিচার করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের অভিযোগ, বিচ্ছিন্ন অপরাধমূলক ঘটনাকেও ভারতীয় গণমাধ্যম রাজনৈতিক বা সাম্প্রদায়িক রূপ দিচ্ছে। যশোরে রানা প্রতাপ বৈরাগী হত্যাকাণ্ডকে কিছু ভারতীয় সংবাদমাধ্যম পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হিসেবে তুলে ধরলেও, বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে স্থানীয়দের বরাতে উঠে এসেছে ভিন্ন তথ্য।
রিপাবলিক বাংলার মতো চ্যানেলগুলো বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের বিজয়কেও ‘ইসলামী বিপ্লব’ আখ্যা দিয়ে ভারতীয় দর্শকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
দক্ষিণ এশীয় রাজনীতিবিষয়ক কূটনীতিক রিয়াজ আহমেদ বলেন, আওয়ামী লীগের পতনের পর দিল্লি বাংলাদেশে হারানো প্রভাব পুনরুদ্ধারে মরিয়া। বিএনপিকে সম্ভাব্য মিত্র হিসেবে দেখা হলেও জামায়াতকে তারা ‘রেড লাইন’ মনে করছে। এ কারণেই গণমাধ্যমের মাধ্যমে জামায়াতকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যাতে বিএনপি তাদের থেকে দূরে থাকে।
অন্যদিকে বিবিসি ও আলজাজিরার মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জামায়াতের রাজনৈতিক পুনর্বাসনকে একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখাচ্ছে। আলজাজিরার বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নের ফলে জামায়াতের প্রতি জনসমর্থন ও সহানুভূতি বেড়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতীয় মিডিয়ার এই প্রচারণা অব্যাহত থাকলে তা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব আরও জোরদার হতে পারে।