অ্যাম্বুলেন্স তো বিলাসিতা, চরের মানুষের শেষ ভরসা স্বজনের কাঁধ!
মনোয়ার হোসেন
প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:০৬ পিএম
গাইবান্ধা দুর্গম চরাঞ্চলে এখনো পৌঁছেনি আধুনিকতার ছোঁয়া। সড়ক নেই, নেই অ্যাম্বুলেন্স - জরুরি মুহূর্তে অসুস্থ মানুষকে কাঁধে করেই নিতে হয় চিকিৎসার পথে। এমনই এক হৃদয়বিদারক বাস্তবতার ছবি সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে নাড়িয়ে দিয়েছে দেশের মানুষের বিবেক।
ঘটনাটি গাইবান্ধা জেলার সদর উপজেলার অন্তর্গত ১৩ নং মোল্লার চর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত চর কাঁচির চর এলাকার । ভৌগোলিকভাবে এটি কুড়িগ্রাম জেলার রাজিবপুর উপজেলার মোহনগঞ্জ এবং জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার সানন্দবাড়ীর সীমান্তবর্তী এক প্রত্যন্ত চর। নদী ও বালুচরে ঘেরা এই অঞ্চলে নেই কোনো পাকা সড়ক। জরুরি চিকিৎসা সেবার জন্য নেই অ্যাম্বুলেন্স কিংবা সহজ যাতায়াতের ব্যবস্থা। ফলে অসুস্থ হয়ে পড়লে রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া যেন জীবনের সঙ্গে যুদ্ধের সমান।
ভাইরাল হওয়া ছবিতে দেখা যায়, এক অসুস্থ ব্যক্তিকে একটি প্লাস্টিকের চেয়ারে বসিয়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে বাঁশের সঙ্গে ঝুলিয়ে দুই কাঁধে তুলে নদী পার করা হচ্ছে। পাশে পানির ভেতর দিয়ে হেঁটে চলছেন কয়েকজন গ্রামবাসী। কারও চোখে উৎকণ্ঠা, কারও মুখে ক্লান্তির ছাপ তবুও থেমে নেই তাদের চলার পথ। কারণ, এই কষ্টকর যাত্রাই তাদের একমাত্র ভরসা চিকিৎসার আশায় পৌঁছানোর।
স্থানীয়দের ভাষ্য, চরাঞ্চলে অসুস্থতা মানেই চরম দুর্ভোগ। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বেড়ে গেলে পরিস্থিতি হয়ে ওঠে আরও ভয়াবহ। নৌকা সবসময় পাওয়া যায় না, আর থাকলেও প্রবল স্রোতের কারণে ঝুঁকি থাকে জীবনের। আবার শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি কমে গেলে তৈরি হয় বালুচর - তখনও বিকল্প না থাকায় এভাবেই কাঁধে করেই রোগী পারাপার করতে হয়।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, আমাদের এখানে কোনো রাস্তা নেই। কেউ অসুস্থ হলে এভাবেই নিতে হয়। অনেক সময় হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যায়।
এই দৃশ্য শুধু একটি ছবি নয় এটি বাংলাদেশের এক অবহেলিত জনপদের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। যেখানে এখনো মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হয়নি, যেখানে একটি অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন শোনা অনেকটাই স্বপ্নের মতো।
প্রতিবার এমন ছবি সামনে এলে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে - স্বাধীনতার এত বছর পরও কেন এই বৈষম্য? কেন দেশের একটি জনগোষ্ঠী এখনো ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা থেকেও বঞ্চিত?
সচেতন মহল মনে করছেন, চরাঞ্চলের এই দীর্ঘদিনের অবহেলা দূর করতে এখনই প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ। জরুরি ভিত্তিতে সড়ক যোগাযোগ উন্নয়ন, নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চালু এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করা সময়ের দাবি। কারণ, জীবন শহরে হোক কিংবা চরে তার মূল্য সমান।তবুও প্রশ্ন থেকে যায় আর কতদিন কাঁধে ভর করেই চলবে এই জীবনের লড়াই?