দিল্লির অনুরোধ উপেক্ষা করে মুদ্রায় সেই মানচিত্রই রাখল নেপাল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬, ০৭:২৩ পিএম
ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ‘বৃহত্তর নেপাল’-এর রাজনৈতিক মানচিত্র নতুন এক রুপির মুদ্রা থেকে সরানোর সিদ্ধান্ত থেকে শেষ পর্যন্ত সরে এসেছে নেপাল সরকার। বিরোধী দল ও জনমতের তীব্র চাপের মুখে সরকার আগের অবস্থানেই ফিরে যাওয়ায় ভারতের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ধাক্কা খেয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
নেপালের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নেপাল রাষ্ট্র ব্যাংক শনিবার জানিয়েছে, নতুন নকশার এক রুপির মুদ্রা শিগগিরই বাজারে ছাড়া হবে। মুদ্রার আকার ও ধাতব উপাদানে পরিবর্তন আনা হলেও এতে আগের মতোই ‘বৃহত্তর নেপাল’-এর রাজনৈতিক মানচিত্র থাকবে। ওই মানচিত্রে ভারতের দাবিকৃত লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ ও কালাপানি অঞ্চলকে নেপালের অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
নেপাল রাষ্ট্র ব্যাংকের মুখপাত্র গুরু প্রসাদ পাউডেল বলেন, নতুন নকশার আনুষ্ঠানিক কপি এখনো হাতে না এলেও আগের মানচিত্র বহাল রাখার বিষয়টি নিশ্চিত। তিনি জানান, নতুন মুদ্রাটি আগের তুলনায় কিছুটা ছোট আকারের এবং ওজনে হালকা হবে।
সীমান্ত বিরোধের কারণ
ভারত-নেপাল সীমান্ত বিরোধের মূল কেন্দ্র উত্তরাখণ্ডের পিথোরাগড় জেলার কাছে ভারত-নেপাল-চীন সীমান্তসংলগ্ন প্রায় ৩৭০ বর্গকিলোমিটার এলাকা। লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ ও কালাপানি—এই তিনটি অঞ্চল নিয়েই দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে।
এই বিরোধের সূত্রপাত ১৮১৬ সালের সুগৌলি চুক্তির ভিন্ন ব্যাখ্যা থেকে। নেপালের দাবি, মহাকালী বা কালী নদীর উৎপত্তি লিম্পিয়াধুরা থেকে হওয়ায় সংশ্লিষ্ট তিনটি অঞ্চল তাদের ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে ভারতের দাবি, নদীর উৎস কালাপানির কাছের একটি ঝরনা। তাই ওই এলাকাগুলো ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের অংশ।
২০২০ সালে নতুন করে উত্তেজনা
২০২০ সালের মে মাসে ভারত ধারচুলা থেকে লিপুলেখ গিরিপথ পর্যন্ত একটি কৌশলগত সড়ক উদ্বোধন করলে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বেড়ে যায়। নেপালের অভিযোগ ছিল, কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ওই সড়ক তাদের দাবিকৃত ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে।
এরপর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির সরকার সংশোধিত রাজনৈতিক মানচিত্র প্রকাশ করে, যেখানে কালাপানি, লিপুলেখ ও লিম্পিয়াধুরাকে নেপালের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরে সেই মানচিত্র সংবিধানসম্মত স্বীকৃতি পায় এবং সরকারি নথি ও প্রচলিত মুদ্রায় স্থান পায়। ভারত শুরু থেকেই এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করে আসছে।
বালেন্দ্র সরকারের অবস্থান
২০২৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ক্ষমতায় আসা প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ ভারতের সঙ্গে অর্থনীতি, বিনিয়োগ, জ্বালানি সহযোগিতা ও সীমান্ত সংযোগে বাস্তবভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। একই সময়ে তিনি চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখলেও বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় ঋণের পরিবর্তে অনুদানভিত্তিক সহায়তাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার নীতি অনুসরণ করছেন।
ক্ষমতায় এসেই বালেন্দ্র সরকার ভারত ও চীনকে লিপুলেখ গিরিপথ ব্যবহার করে কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রা আয়োজন না করার আহ্বান জানায়। তবে ভারত জানিয়ে দেয়, ১৯৫৪ সাল থেকেই ওই পথ ব্যবহার করে তীর্থযাত্রা পরিচালিত হচ্ছে এবং সীমান্ত বিরোধ কেবল দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান হওয়া উচিত।
সমালোচনার মুখে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন
গত ২০ জুলাই সরকার বিতর্কিত মানচিত্রের পরিবর্তে মুস্তাং জেলার মারং গ্রামের ঐতিহাসিক ‘লো ঘিয়াকার মঠ’-এর ছবি নতুন মুদ্রায় যুক্ত করার সিদ্ধান্ত অনুমোদন দেয়। অনেকেই এটিকে ভারত-নেপাল সম্পর্ক উন্নয়নের কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখলেও সরকার দাবি করে, এটি ছিল নিয়মিত মুদ্রা সংস্কারের অংশ।
তবে এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে সমালোচনা শুরু হয়। বিরোধী দল ও জনমতের চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত সরকার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে। ফলে নতুন এক রুপির মুদ্রাতেও ‘বৃহত্তর নেপাল’-এর রাজনৈতিক মানচিত্র বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা