ভারতীয় বাহিনীর ঐতিহাসিক পরাজয়ের দলিল ‘বড়াইবাড়ীর যুদ্ধ’
মনোযোগ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৩৯ পিএম
আজ ১৮ এপ্রিল, বড়াইবাড়ী দিবস। ২০০১ সালের এই দিনে কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার বড়াইবাড়ী সীমান্তে সংঘটিত হয় এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, যা বাংলাদেশের সীমান্ত ইতিহাসে গৌরবের এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে স্বীকৃত।
সেদিন ভোর আনুমানিক ৪টার দিকে ভারতীয় কমান্ডো, সেনা ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রায় ৪০০ সদস্যের একটি যৌথ দল কাঁটাতারের বেড়া অতিক্রম করে বড়াইবাড়ী এলাকায় প্রবেশ করে। এ সময় স্থানীয় কৃষক মিনহাজ উদ্দিন ধানক্ষেতে সেচ দিতে গিয়ে বিদেশি সেনাদের উপস্থিতি দেখতে পান। তারা তার কাছে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ক্যাম্পের অবস্থান জানতে চাইলে তিনি কৌশলে ভুল তথ্য দিয়ে দ্রুত খবর পৌঁছে দেন।
খবর পেয়ে তৎকালীন বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী দ্রুত প্রস্তুতি গ্রহণ করে এবং আশপাশের ক্যাম্পগুলোকে সতর্ক করে। ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ভারতীয় বাহিনী পূর্ব ও দক্ষিণ দিক থেকে গুলি চালিয়ে আক্রমণ শুরু করে। সংঘর্ষের শুরুতেই শহীদ হন ল্যান্স নায়েক ওয়াহিদুজ্জামান।
সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়ে ওঠে। সকাল ১০টার দিকে অতিরিক্ত বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছালে যুদ্ধ পূর্ণমাত্রায় রূপ নেয়। দুই দিনব্যাপী সংঘর্ষে আরও দুইজন সৈনিক শহীদ হন—সিপাহী আব্দুল কাদের ও সিপাহী মাহফুজুর রহমান।
অন্যদিকে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ১৬ জন সদস্য নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। স্থানীয়দের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। এ ছাড়া দুইজন ভারতীয় সৈনিককে জীবিত আটক করা হয় এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে নিহতদের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।
ঘটনার পেছনে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ জড়িয়ে ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় সিলেট অঞ্চলের পাদুয়া এলাকায় একটি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প ছিল। স্বাধীনতার পর ওই এলাকা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ চলতে থাকে। ১৯৯৯ সালের বৈঠকে এলাকা ছেড়ে দেওয়ার আলোচনা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। পরবর্তীতে ২০০১ সালের ১৫ এপ্রিল বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী পাদুয়ায় অবস্থান নিয়ে ক্যাম্প স্থাপন করলে উত্তেজনা চরমে ওঠে এবং এরই ধারাবাহিকতায় ১৮ এপ্রিল বড়াইবাড়ীতে হামলার ঘটনা ঘটে।
এই যুদ্ধে বাংলাদেশের তিনজন সৈনিক শহীদ হন এবং অন্তত ১২ জন আহত হন। সীমান্তবর্তী অন্তত ২৫টি গ্রামের প্রায় ৪০ হাজার মানুষ আতঙ্কে বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
স্থানীয়রা আজও সেই দিনের ভয়াবহ স্মৃতি বহন করছেন। তাদের ভাষ্যমতে, হঠাৎ আক্রমণ ও গুলিবর্ষণে পুরো এলাকা আতঙ্কে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। শিক্ষকদের মতে, বড়াইবাড়ীর যুদ্ধ সীমান্তে বাংলাদেশের সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
বড়াইবাড়ীর এই সংঘর্ষ আজও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বীরত্ব, আত্মত্যাগ ও প্রতিরোধের এক স্মরণীয় ইতিহাস হয়ে রয়েছে।