‘আমি এখন কার জন্য বাঁচব?’, মা ও তিন বোনের মরদেহের সামনে সিফাতের আহাজারি
সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬, ০৫:০০ পিএম
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে সংঘটিত ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে এক মুহূর্তে বদলে গেছে আঠারো বছর বয়সী জুনায়েদ ইসলাম সিফাতের জীবন। প্রতিদিনের মতো কাজের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হলেও কয়েক ঘণ্টা পর বাড়ি ফিরে তাকে দেখতে হয় মা ও তিন বোনের নিথর দেহ। পরিবারের চার সদস্যকে হারিয়ে এখন শোক, বেদনা ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে এই তরুণের।
জানা গেছে, সিফাতের পরিবার দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করছিল। ২০১৯ সালে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান তার বাবা কামাল হোসেন। এরপর পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন মা শাহিনুর বেগম। চরম আর্থিক সংকটের মধ্যেও সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে যেতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন তিনি। বড় সন্তানরাও পরিবারের পাশে দাঁড়াতে বিভিন্ন কাজে যুক্ত হয়েছিল।
পরিবারটি যখন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল, তখনই বৃহস্পতিবার সকালে নৃশংস হামলার শিকার হন শাহিনুর বেগম, তার বড় মেয়ে সায়মা আক্তার, মেজো মেয়ে ইকরা আক্তার এবং ছোট মেয়ে শিফা আক্তার। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তাদের হত্যা করা হয়। পরে এ ঘটনায় অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার স্থানীয় জনতার হাতে গণধোলাইয়ের শিকার হয়ে নিহত হয়।
রায়পুর সরকারি ডিগ্রি কলেজের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী সিফাত এখন কার্যত একা হয়ে পড়েছেন। বাবা-মা ও তিন বোনকে হারিয়ে ভেঙে পড়া এই তরুণ বারবার জানতে চাইছেন, তার পরিবারের সদস্যদের কী অপরাধ ছিল। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, এখন আর কার জন্য বাঁচবেন, কার কাছে নিজের কষ্টের কথা বলবেন—সেই উত্তর তার জানা নেই।
সিফাতের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ওমর ফারুক রনি জানান, পরিবারের সবাই ছিল অত্যন্ত মেধাবী এবং শিক্ষানুরাগী। অনেক সংগ্রামের মধ্য দিয়েও তারা ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছিল। কিন্তু একটি মর্মান্তিক ঘটনায় সেই স্বপ্ন চিরতরে শেষ হয়ে গেল।
স্থানীয় ব্যবসায়ী নেতা সাইফুল ইসলাম মুরাদ বলেন, প্রায় সাত থেকে আট মাস আগে সিফাত একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন। স্বল্প আয়ের মধ্যেও তিনি লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছিলেন এবং পরিবারের দায়িত্ব ভাগ করে নিচ্ছিলেন। সবার সহযোগিতায় পরিবারটি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল। এমন একটি পরিবারের ওপর নেমে আসা এই বিপর্যয় অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
ঘটনার পর জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। তদন্তে জানা যায়, অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার একসময় একই ভবনে ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করতেন। পূর্ব পরিচয়ের কারণে তিনি সহজেই ওই বাসায় প্রবেশ করতে সক্ষম হন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পুলিশ সূত্রে আরও জানা গেছে, ঘটনার সময় এক প্রতিবেশী অন্তরকে সন্দেহজনক অবস্থায় দেখে তার পরিচয় জানতে চান। তখন তিনি নিজেকে পানির পাইপ মেরামতের কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন। তবে প্রতিবেশীর সতর্কতার কারণে দ্রুত বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে আসে এবং ঘটনার রহস্য উদঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।