প্রেমের বিয়ের পর প্রতারণার অভিযোগ, ন্যায়বিচার চাইলেন টাঙ্গাইলের যুবক নূর আলম
সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ১১:৪২ পিএম
প্রেমের সম্পর্কের পর বিয়ে, দাম্পত্য কলহ, ১২ লাখ টাকার আর্থিক লেনদেন, চেক ডিজঅনার এবং একাধিক আইনি জটিলতার ঘটনায় ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার বিন্দুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা মো. নূর আলম মিয়া (২৫)। তিনি বর্তমানে সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে অধ্যয়ন করছেন।
সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া লিখিত ও মৌখিক অভিযোগে নূর আলম দাবি করেন, টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার উত্তরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. শামসুল মিয়ার মেয়ে সাদিয়া আক্তারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্কের পর ২০২৫ সালের ১৯ মার্চ ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী তাদের বিয়ে হয়।
তার অভিযোগ, বিয়ের পর তিনি জানতে পারেন, বিয়ের আগে তার স্ত্রীর একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, স্ত্রী অতীতের কিছু ব্যক্তিগত ঘটনার কথাও তাকে জানান। নূর আলমের দাবি, এসব বিষয় জানার পরও তিনি অতীতকে গুরুত্ব না দিয়ে সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেন এবং পারিবারিক জীবন স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্নভাবে উদ্যোগ নেন।
অভিযোগে তিনি আরও বলেন, দাম্পত্য জীবনের কয়েক মাস পর তার স্ত্রী গর্ভবতী হন। পরে স্ত্রীর অনুরোধে তাকে বাবার বাড়িতে রেখে আসার পর তাকে না জানিয়েই গর্ভের সন্তান নষ্ট করা হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন। এতে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন বলেও উল্লেখ করেন।
নূর আলমের ভাষ্য, পরবর্তীতে স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনতে শ্বশুরবাড়িতে গেলে তিনি মোবাইল ফোনে এক ব্যক্তির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের তথ্য দেখতে পান। বিষয়টি শ্বশুরকে জানানো হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। এরপর উভয় পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে একাধিকবার সমঝোতার চেষ্টা করা হলেও তা সফল হয়নি বলে দাবি করেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইল শহরে তার নামে জমি কিনে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তার কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা নেওয়া হয়। ওই অর্থের নিরাপত্তা হিসেবে তাকে অগ্রণী ব্যাংকের একটি স্বাক্ষরিত চেক দেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি।
তার দাবি, কিছুদিন পর স্ত্রী বাবার বাড়িতে চলে যান এবং আর দাম্পত্য জীবনে ফিরে আসেননি। পরে ২০২৬ সালের ৩০ মার্চ স্ত্রী তালাকের নোটিশ পাঠান। যদিও পরে ব্যক্তিগতভাবে সংসার করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন, তবে পারিবারিক কারণে তা সম্ভব নয় বলে তাকে জানানো হয় বলে অভিযোগ করেন নূর আলম।
দাম্পত্য সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে তিনি ২০২৬ সালের ২৭ এপ্রিল টাঙ্গাইল জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে মামলা করেন, যা বর্তমানে বিচারাধীন। এছাড়া ১৮ জুন আদালতে আরও একটি আবেদন করেন। তার দাবি, ওই মামলার শুনানিতে তার স্ত্রী স্বামীর সঙ্গে আর সংসার করবেন না বলে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।
এদিকে, ২০২৬ সালের ৫ জুলাই নিরাপত্তা হিসেবে পাওয়া চেকটি ব্যাংকে জমা দিলে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় সেটি ডিজঅনার হয়। এরপর ৬ জুলাই আইনজীবীর মাধ্যমে ১৮৮১ সালের নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টস আইনের বিধান অনুযায়ী আইনি নোটিশ পাঠানো হয়। নোটিশে ৩০ দিনের মধ্যে ১২ লাখ টাকা পরিশোধের দাবি জানানো হয়েছে বলে অভিযোগকারীর ভাষ্য।
নূর আলমের অভিযোগ, বর্তমানে তার স্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি আর সংসার করবেন না এবং নেওয়া অর্থও ফেরত দেবেন না। পাশাপাশি টাকা দাবি করলে তার বিরুদ্ধে যৌতুক ও নারী নির্যাতনসহ বিভিন্ন মামলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, তার অভিযোগের সমর্থনে ব্যাংকের চেক, চেক ডিজঅনার মেমো, আইনি নোটিশ, আদালতের নথি, মোবাইল ফোনের কথোপকথন, বার্তা ও কল রেকর্ডসহ বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত সাদিয়া আক্তারের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের ব্যবহৃত নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। অভিযোগে উল্লেখ থাকা অপর ব্যক্তির সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
নূর আলম মিয়ার উত্থাপিত ১২ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন অভিযুক্ত স্ত্রী সাদিয়া আক্তার। উল্টো অভিযোগ করে তিনি বলেন, নূর আলমই বিভিন্ন সময়ে তাঁর বাবার কাছ থেকে এবং সাদিয়ার নিজের জমানো টাকা আত্মসাৎ করেছেন। নূর আলমের আর্থিক স্বচ্ছলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সাদিয়া বলেন, যাঁর নিজেরই থাকার মতো ভালো ব্যবস্থা নেই, তিনি কীভাবে ১২ লাখ টাকা ধার দেবেন? মূলত নূর আলম ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে এবং সাদিয়ার পরিবারের থেকে টাকা নিয়ে সেই লোন শোধ করেছিলেন। জমি কেনার নাম করে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কোনো ঘটনাই ঘটেনি।
অগ্রণী ব্যাংকের স্বাক্ষরিত চেকের বিষয়ে সাদিয়া আক্তার জানান, কলেজে ভালো ফলাফলের জন্য সরকারিভাবে পাওয়া ২৫,০০০ টাকা রাখার জন্য নূর আলমই সাদিয়ার নামে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়েছিলেন। তবে সেই অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড, নাম ও নাম্বারসহ সমস্ত নিয়ন্ত্রণ নূর আলমের কাছেই ছিল। পরবর্তীতে ব্যাংক থেকে কিছু টাকা তোলার সময় নূর আলম কৌশলে চেকে সাদিয়ার স্বাক্ষর ও ফোন নাম্বার লিখিয়ে নিয়েছিলেন। নূর আলম এখন সেই টাকা তোলার সময়কার পুরনো স্বাক্ষর করা চেকটি ব্যবহার করে ডিজঅনারের নাটক সাজাচ্ছেন এবং জালিয়াতির মাধ্যমে মিথ্যা মামলা করার চেষ্টা করছেন।
সংসার ছেড়ে চলে যাওয়া এবং দাম্পত্য বিচ্ছেদের মূল কারণ হিসেবে নূর আলমের চরম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনকে দায়ী করেছেন সাদিয়া। তিনি অভিযোগ করেন, বিয়ের আগে নূর আলম নিজের ব্যাপারে যেসব তথ্য দিয়েছিলেন, তার সবই ছিল মিথ্যা। বিয়ের মাত্র দুই-তিন দিন পর থেকেই সামান্য বিষয় নিয়ে নূর আলম সাদিয়ার ওপর অমানুষিক নির্যাতন শুরু করেন। সাদিয়াকে মারধর করে দেওয়ালে মাথা ঠুকে দেওয়া, গলা টিপে ধরা এবং গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করার মতো ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি জানান। এছাড়া নূর আলম সাদিয়ার চরিত্র নিয়ে প্রতিনিয়ত মিথ্যা অপবাদ দিতেন এবং পরিবারের সাথে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিলেন।
আদালতে দেওয়া জবানবন্দির সত্যতা নিশ্চিত করে সাদিয়া বলেন, নূর আলম সাদিয়ার বাবা-মার বিরুদ্ধে মারধর করে মেয়েকে ছিনিয়ে নেওয়ার যে মামলা করেছিলেন, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। নূর আলম নিজেই সাদিয়াকে মারধর করে সাদিয়ার বাবার বাড়িতে ফেলে রেখে এসেছিলেন এবং সাদিয়া আদালতে নিজের ইচ্ছায় সজ্ঞানে জবানবন্দি দিয়েছেন। এছাড়া 'তাওহিদ' নামের এক যুবকের সাথে বিয়ের আগের সম্পর্কের যে দাবি নূর আলম করেছেন, তাও সম্পূর্ণ বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাওহিদ আমার সহপাঠী ছিলেন এবং তাঁর অন্য জায়গায় বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। নূর আলম সাদিয়ার চরিত্র হনন করতেই এই গল্প সাজিয়েছেন।
সাদিয়া আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নূর আলম নিজে অন্যায়, জালিয়াতি ও নির্যাতন করে এখন মিডিয়ার সামনে মিথ্যা তথ্য দিয়ে 'ভালো মানুষ' সাজার চেষ্টা করছেন। নূর আলমের এই অপপ্রচারের কারণে সাদিয়ার সামাজিক মর্যাদা ও সম্মান চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে। লোকলজ্জার ভয়ে এতদিন চুপ থাকলেও এখন আইনি ও সামাজিকভাবে নূর আলমের এই জালিয়াতির মুখোশ উন্মোচন এবং নিজের ওপর হওয়া অন্যায়ের সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার চান সাদিয়া আক্তার।