পুরান ঢাকার ‘শ্রমিক মিরাজ’ পরিচয়ে সীমান্ত পার হতে চেয়েছিল ডেভিড ইমন
সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৮ পিএম
চুল-গোঁফ কেটে চেহারার আমূল পরিবর্তন, পরনে সাধারণ পোশাক। পরিচয়ও বদলে নিয়েছিলেন ‘মিরাজ’ নামে এক শ্রমিক হিসেবে। কিন্তু সব কৌশল ব্যর্থ করে যশোর সীমান্ত এলাকা থেকে চট্টগ্রামের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
বুধবার (২৯ জুলাই) ভোরে যশোরের ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। পরে সকালে তাকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, ভারতে পালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই তিনি সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করছিলেন।
গ্রেপ্তারের সময় ধারণ করা একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি নিজের নাম-পরিচয় ও ঠিকানা নিয়ে একাধিকবার ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন। নিজেকে পুরান ঢাকার বাসিন্দা ও পেশায় শ্রমিক দাবি করে নাম বলেন ‘মিরাজ’। তবে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা এবং শারীরিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে পুলিশ নিশ্চিত হয়, তিনি আসলে চট্টগ্রামের কুখ্যাত সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর ইউনিয়নের বাসিন্দা মোবারক হোসেনের অপরাধজগতে প্রবেশ ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়। ফটিকছড়ির সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও তৎকালীন শীর্ষ সন্ত্রাসী আবু তৈয়বের অনুসারী হিসেবে তিনি এলাকায় চুরি, অবৈধ বালু উত্তোলন এবং বিভিন্ন সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তিনি ফটিকছড়ি ছেড়ে চট্টগ্রাম শহরে চলে আসেন। সেখানে ‘ছোট সাজ্জাদ’-এর মাধ্যমে অপরাধচক্রে যুক্ত হয়ে নিজের পরিচয় বদলে ‘ডেভিড ইমন’ নাম গ্রহণ করেন। পরে ‘বড় সাজ্জাদ’ গ্রুপে যোগ দিয়ে ধীরে ধীরে বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে ওঠেন। ছোট সাজ্জাদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর পুরো বাহিনীর দায়িত্ব তার হাতে চলে যায় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শহরে আসার পর হত্যা, চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন ডেভিড ইমন। ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট বাকলিয়া এলাকায় আনিস ও মোহাম্মদ হাসান হত্যা, গত বছরের ৩০ মার্চের আলোচিত জোড়া হত্যা এবং একই বছরের ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় ‘ঢাকাইয়া আকবর’ হত্যা মামলার তদন্তে তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়।
এ ছাড়া চলতি বছরের জুন ও জুলাই মাসে চট্টগ্রামের একাধিক ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের মালিকদের কাছে তার নামে প্রায় দেড় কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে। চন্দপুরা এলাকার একটি ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠানে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে দুই কোটি টাকা এককালীন এবং মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি বড়দিঘির পাড় এলাকার এক আবাসন ব্যবসায়ীর কাছে ৫০ লাখ টাকা এবং জিইসি এলাকার এক ব্যবসায়ীর কাছে হোয়াটসঅ্যাপে চাঁদা দাবি করে ব্যবসা বন্ধের হুমকিও দেন তিনি।
পুলিশ জানায়, গত ২৬ জুলাই রাতে চট্টগ্রাম নগরীর অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কের ওয়াজেদিয়া এলাকা থেকে বিদেশি পিস্তল ও গুলিসহ ডেভিড ইমনের দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তারা ইমনের চাঁদাবাজি চক্র সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই যশোর জেলা পুলিশের বিশেষ দল ঝুমঝুমপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে লুঙ্গি-গেঞ্জি পরা অবস্থায় তাকে গ্রেপ্তার করে। তবে অভিযানের সময় তার সহযোগী রায়হান পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মো. নাজিমুল হক জানান, দীর্ঘদিন ধরেই গোয়েন্দা নজরদারিতে ছিলেন ডেভিড ইমন। প্রথমে তিনি ঢাকায় আত্মগোপন করেছিলেন। পরে যশোর সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করার সময় তাকে আটক করা সম্ভব হয়।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গণমাধ্যম) মো. রাসেল জানান, বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ডেভিড ইমনের গ্রেপ্তার ও তার বিরুদ্ধে থাকা বিভিন্ন অপরাধের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে।