বিশ্বকাপের বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে তীব্র বিরোধ, ফিফার পরিকল্পনায় আপত্তি উয়েফার
খেলাধুলা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫০ পিএম
বিশ্বকাপকে ঘিরে নতুন ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ঘোষণা করায় বিশ্ব ফুটবলের দুই প্রভাবশালী সংস্থা ফিফা ও উয়েফার মধ্যে বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশ্বকাপ-সংক্রান্ত বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নতুন প্রতিষ্ঠান গঠনের পরিকল্পনা করেছে ফিফা, তবে এই উদ্যোগকে ফুটবলের ঐতিহ্য ও শাসনব্যবস্থার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে উয়েফা।
৪৮ দলের সর্ববৃহৎ বিশ্বকাপ সফলভাবে আয়োজনের পর ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ নামে ২ কোটি ডলার মূল্যের একটি নতুন অঙ্গপ্রতিষ্ঠান গঠনের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে ফিফা। এই প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ সংখ্যালঘু শেয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে প্রায় ৪২০ কোটি ডলার মূলধন সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি।
বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগান সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী খুঁজে বের করার কাজ শুরু করেছে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো দাবি করেছেন, শেয়ার বিক্রি থেকে অর্জিত প্রতিটি ডলারই বিশ্ব ফুটবলের উন্নয়নে ব্যয় করা হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফিফার ২১১টি সদস্য অ্যাসোসিয়েশন অবকাঠামো উন্নয়ন, নারী ফুটবল এবং তৃণমূল পর্যায়ের ফুটবল বিকাশে এককালীন ২ কোটি ডলার পর্যন্ত অনুদান পাবে। ২০৩৫ থেকে ২০৩৮ মেয়াদে এই অনুদান ২ কোটি ৪০ লাখ ডলারে উন্নীত করারও প্রস্তাব রয়েছে। ইনফান্তিনোর মতে, এর মাধ্যমে বিশ্ব ফুটবলে সম্পদের আরও ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত হবে এবং ছোট দেশগুলোর ফুটবল উন্নয়নের সুযোগ বাড়বে।
তবে ফিফার এই পরিকল্পনায় তীব্র আপত্তি জানিয়েছে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা। সংস্থাটির দাবি, অর্থ সংগ্রহের নামে ফিফা এমন একটি সীমা অতিক্রম করছে, যা ফুটবলের ঐতিহ্য ও পরিচয়কে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
এক বিবৃতিতে উয়েফা বলেছে, ফুটবলের শাসনব্যবস্থা কিংবা ঐতিহ্য কোনোভাবেই কেনাবেচার সম্পদ হতে পারে না। সংস্থাটি আরও উল্লেখ করেছে, ফুটবলের মালিক কেউ নয় এবং এটি বিক্রি করার অধিকারও কোনো প্রতিষ্ঠানের নেই।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ফিফা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে এগোলে উয়েফাভুক্ত দেশগুলো বিশ্বকাপ বর্জনের মতো কঠোর অবস্থান বিবেচনা করতে পারে। এ বিষয়ে আলোচনা করতে চলতি সপ্তাহেই উয়েফার ৫৫টি সদস্য দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এর আগে ২০২১ সালে প্রতি দুই বছর পরপর বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছিল ফিফা। তখনও উয়েফার তীব্র বিরোধিতা এবং বিশ্বকাপ বর্জনের হুমকির মুখে শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসে সংস্থাটি। এবারও একই ধরনের কৌশল নেওয়া হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামও প্রকাশ্যে ফিফার নতুন পরিকল্পনার সমালোচনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, বিশ্বকাপ কোনো বিক্রয়যোগ্য পণ্য নয়; এটি বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ফুটবল প্রতিযোগিতা। এর কোনো অংশ বিক্রি করার অর্থ ফুটবলের মূল চেতনাকেই বিক্রি করে দেওয়া।
বিশ্লেষকদের মতে, সম্প্রচারস্বত্ব, স্পনসরশিপ, টিকিট বিক্রি ও বিপণন থেকে বিশ্বকাপ দীর্ঘদিন ধরেই ফিফার সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস। তবে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ-সম্পর্কিত ব্যবসায়িক কাঠামোয় বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের অংশীদার করার উদ্যোগ ফুটবল বিশ্বে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে উন্নয়নের জন্য অতিরিক্ত অর্থায়নের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে অনেকের আশঙ্কা, বিনিয়োগকারীদের মুনাফার স্বার্থ ভবিষ্যতে ফুটবলের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলতে পারে।