ইভিএম প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ, নেপথ্যে প্রভাবশালী চক্র
মনোযোগ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৫৪ পিএম
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) কেনাকাটায় ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র ও অডিট প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেড় লাখের বেশি ইভিএম কেনার এই প্রকল্পে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা অপচয় ও আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে।
মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) অডিট প্রতিবেদন এবং নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ৩ হাজার ৮২৫ কোটি টাকার এই প্রকল্পে বাজারদরের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি দামে ইভিএম কেনা হয়। এতে প্রায় ৩ হাজার ১৭২ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে প্রকল্প পরিচালক এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন সরকারে প্রভাবশালী একটি মহল এই প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত ছিল। তাদের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-এর নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, জাতীয় পরিচয়পত্র অনুবিভাগের সাবেক মহাপরিচালক মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম, বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুলতানুজ্জামান মুহাম্মদ সালেহ উদ্দিন, সাবেক নির্বাচন কমিশনার শাহাদাত হোসেন চৌধুরী এবং তৎকালীন ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদের নাম উঠে এসেছে।
জানা যায়, বিএনপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন মাস আগে তড়িঘড়ি করে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। শুরুতে ১৫০টি আসনে ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত মাত্র ছয়টি আসনে তা প্রয়োগ করা হয়। পরে কিছু উপনির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সীমিতভাবে এর ব্যবহার দেখা যায়।
অডিট প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্পে বাস্তবসম্মত কোনো মাঠপর্যায়ের সমীক্ষা ছাড়াই কাগুজে তথ্যের ভিত্তিতে অনুমোদন দেওয়া হয়। এমনকি ইভিএম সংরক্ষণ, পরিবহন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। ফলে বর্তমানে দেড় লাখ মেশিনের মধ্যে মাত্র প্রায় ৪০ হাজার সচল রয়েছে, বাকিগুলো অকেজো বা মেরামতযোগ্য অবস্থায় পড়ে আছে।
এদিকে নিম্নমানের মেশিন সরবরাহ এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে নির্বাচন ভবনে অভিযান চালিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পুরো প্রক্রিয়ায় আর্থিক বিধিবিধান লঙ্ঘন, অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ এবং সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির অপব্যবহার করা হয়েছে।
এ ছাড়া ইভিএমের ওয়ারেন্টি নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনকে ১০ বছরের ওয়ারেন্টির কথা জানানো হলেও বাস্তবে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মাত্র এক বছরের ওয়ারেন্টি দিয়েছে, যার ফলে অধিকাংশ মেশিন নষ্ট হওয়ার পর কোনো সেবা পাওয়া যায়নি।
বর্তমান নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন ইতোমধ্যে ভবিষ্যৎ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার সুপারিশ করেছে। একইসঙ্গে নির্বাচন কমিশনও আনুষ্ঠানিকভাবে ইভিএম ব্যবহারে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছে। ফলে হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প এখন কার্যত প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের বড় উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।