বাংলাদেশিদের ভিসা দিচ্ছে না বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, কিন্তু কেন?

মনোযোগ প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ১৬ নভেম্বর ২০২৫, ১১:০৯ এএম

ছবি: সংগৃহীত

বিদেশে উচ্চশিক্ষা, চাকরি বা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে ভিসার আবেদন করেও শেষ মুহূর্তে ভিসা না পাওয়ার ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে হঠাৎই বেড়ে গেছে। স্কলারশিপ পাওয়া শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে নিয়মিত পর্যটক কিংবা বিদেশগামী শ্রমিক—সব ধরনের আবেদনকারীর মধ্যেই এখন একই অভিযোগ: আগের মতো ভিসা মিলছে না।

ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মতো যে দেশগুলো থেকে আগে তুলনামূলক সহজেই ভিসা পাওয়া যেত, সেসব দেশ থেকেও এখন ভিসা পাওয়ায় জটিলতা দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন ভ্রমণ ও অভিবাসন–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। অথচ ভারতের পর্যটন ভিসা ছাড়া আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো দেশই বাংলাদেশিদের ওপর সরাসরি ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, সম্প্রতি ভিসার অপব্যবহার বেড়েছে। কিছু মানুষ ভ্রমণ বা সহজ ভিসা পাওয়া দেশের ভিসা ব্যবহার করে অন্য দেশে অনিয়মিতভাবে যাওয়ার চেষ্টা করছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তার ওপর বিদেশে রাজনৈতিক বিরোধে জড়িয়ে পড়া নেতাকর্মীদের আচরণও দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। পাশাপাশি পাসপোর্টের বৈশ্বিক র‍্যাংকিং নিচে নেমে আসাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

এ অবস্থায় দেশটির অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত, দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

কোন কোন দেশ ভিসা দিচ্ছে না?

সরকারিভাবে নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও বাস্তবে বাংলাদেশিদের ভিসা পাচ্ছেন না—এমন অভিযোগ আসছে বহু দেশকে ঘিরে। পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, পড়াশোনা, কর্মসংস্থান ও ভ্রমণ—সবক্ষেত্রেই ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

টোয়াব সভাপতি মো. রাফেউজ্জামানের ভাষায়, “ইন্ডিয়া, ইউএই, কাতার, বাহরাইন, ওমান, উজবেকিস্তান, সৌদি আরব, ভিয়েতনাম—এসব দেশ এখন ভিসা দিচ্ছে না।”

তিনি আরও জানান, থাইল্যান্ডের ভিসা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সময় নিচ্ছে। সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া খুব কম পরিমাণে ভিসা দিচ্ছে। ফিলিপাইনের ভিসা প্রক্রিয়াও ধীর, আর ইন্দোনেশিয়া ভিসা ফি বাড়িয়েছে। এমনকি শ্রীলঙ্কার ই–ভিসাও পাওয়া যাচ্ছে দুই–তিন দিনের বিলম্বে।

২০২৪ সালের আগস্টের গণ–অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ভারত বাংলাদেশিদের পর্যটন ভিসা বন্ধ করে দেয়। তবে কেবল ভারতই নয়—ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার বেশ কিছু দেশ থেকেই এখন ভিসা পাওয়া কঠিন—যদিও তা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।

পর্যটন ব্যবসায়ী মহিউদ্দিন সেলিম বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত প্রতি বছর পাঁচ–ছয় লাখ ভিসা দিলেও এবছর তা দুই লাখের কাছাকাছিও নয়। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশও ভিসা ইস্যু কমিয়ে দিয়েছে বলে জানান তিনি।

কেন ভিসা দিচ্ছে না?

ভিসা জটিলতার কারণ হিসেবে অনেকেই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে কারণ হিসেবে মনে করলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, এর মূল আরও গভীরে। তাদের মতে, অনিয়মিত পথে বাংলাদেশিদের বিভিন্ন দেশে ঢোকার প্রবণতা, আর তা করতে সহজলভ্য দেশের ভিসা নিয়ে অন্যদেশে পাড়ি জমানোর ঘটনা দেশগুলোর প্রশাসনের চোখে পড়েছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, ‘ভিসা পাওয়ার সুযোগে বা এটাকে অপব্যবহার করে অনেকে অনিয়মিতভাবেও যাচ্ছে। সে প্রবণতার কারণেই দেশগুলোতে খুব বেশি অভিবাসনবিরোধী বাতাবরণ নেই, সেই দেশগুলোও এখন সতর্ক হচ্ছে। যেমন - ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড।

এমনকি কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ভ্রমণ ভিসায় বিদেশে লোক পাঠিয়ে শ্রমিক ভিসায় রূপান্তর করেন বলেও অভিযোগ আছে। আবার প্রতিবেশী দেশ থেকে বাংলাদেশের ওপর আরোপ করা ভিসা নিয়ন্ত্রণের কারণে ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু দেশ আরো বেশি সতর্কতা অবলম্বন করছে বলেও মনে করছেন কেউ কেউ।

যার কারণে অল্প সংখ্যক মানুষের 'অনিয়মিত' বা আইন বহির্ভুত কাজে যুক্ত থাকার ফল অনেক বেশি সংখ্যক মানুষকে ভোগ করতে হচ্ছে বলে জানাচ্ছেন বিশ্লেষকরা।

একইসাথে সেসব দেশে গিয়ে প্রকাশ্যে কোন্দল বা বিবাদে জড়ানোর ঘটনাও দেশের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যার প্রকাশ দেখা যাচ্ছে নানা দেশের ভিসা জটিলতায়।

ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে পাসপোর্টের র‍্যাংকিংয়ের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক নাগরিকত্ব ও পরিকল্পনা বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের তথ্যমতে, দুর্বলতম পাসপোর্টের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম।

বিশ্বের ৩৮টি দেশে ভিসা ছাড়াই ভ্রমণের সুযোগ আছে বাংলাদেশের নাগরিকদের। এই তালিকার বেশিরভাগ দেশই আফ্রিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের, যেখানে বাংলাদেশিদের যাতায়াতের প্রবণতাও কম।

এছাড়াও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় অবৈধ অভিবাসনের সুযোগ খোঁজার প্রবণতা বেড়েছে।

সমাধান কি আছে?

গত বছর ডিসেম্বরে ভারতের ভিসা সীমিত থাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর ভিসা সেন্টার দিল্লি থেকে অন্য দেশে সরাতে কূটনীতিকদের অনুরোধ জানিয়েছিলেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা।

তিন মাস পর মার্চ মাসে ঢাকা থেকেই নয়টি দেশের ভিসা প্রক্রিয়া শুরু হয়, কিন্তু সেই দেশগুলো থেকেও ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা যাচ্ছে।

কয়েক মাস আগে সংবাদমাধ্যমে ভিসা জটিলতার কথা স্বীকার করে নেন পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা। দায়ী করেন, বাংলাদেশিদের কর্মকাণ্ডকে।

কিন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সরকারকে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যাচ্ছে না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের ভ্রমণ ভিসার ক্ষেত্রে জটিলতার বিষয়টি পুরোপুরি রাজনৈতিক। সেক্ষেত্রে নির্বাচিত সরকার না আসা পর্যন্ত পরিস্থিতি বদলানোর সুযোগ নেই।

তবে ভারত ছাড়া অন্য দেশগুলোতে কূটনৈতিকভাবে উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ আছে।

সেক্ষেত্রে অসৎ উপায়ে যারা দেশের বাইরে লোক পাঠাচ্ছেন কিংবা যারা যাচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির।

তিনি আরো বলেন, ‘ডমেস্টিক জায়গায় (দেশের ভেতরে) হাত দিয়ে সেখানে যথোপযুক্ত আইনি প্রক্রিয়ায় সমাধানের চেষ্টা করছি—এটা যদি দৃশ্যমান করতে পারি, তাহলে আমার ধারণা ভিসা প্রক্রিয়ার এই বাড়তি জটিলতা আমরা এই সাম্প্রতিককালে যা দেখছি সেটা থেকে হয়তো বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে।’

সূত্র: বিবিসি বাংলা

প্রকাশক: মাহমুদুল হাসান

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: সুজন মাহমুদ

বার্তা সম্পাদক: শরিফুল ইসলাম

যোগাযোগের ঠিকানা:

কুড়িগ্রাম অফিস: কলেজ রোড, চর রাজিবপুর, কুড়িগ্রাম।

ঢাকা অফিস: ২/এ, কালাচাঁদপুর মেইন রোড, ঢাকা- ১২১২

ইমেইল: monojogprokashnews@gmail.com

মোবাইল: 09658369970