সহজ কিস্তির কঠিন শাস্তি! ফ্রিজের কিস্তি না দিতে পেরে জেলে গৃহবধূ আনোয়ারা
সুজন মাহমুদ, বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫, ১০:৫৮ পিএম
সহজ কিস্তিতে পণ্য কেনার ফাঁদে পড়ে চেক জালিয়াতি মামলার দণ্ডে কারাভোগ করতে হলো কুড়িগ্রামের এক হতদরিদ্র গৃহবধূকে। ওয়ালটন ব্র্যান্ডের একটি ফ্রিজের কিস্তির টাকা সময়মতো পরিশোধ করতে না পারায় গ্রেফতার হয়ে দুই দিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেয়েছেন আনোয়ারা বেগম (৩২)। তিনি কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ভোগডাঙা ইউনিয়নের চর বড়াইবাড়ি গ্রামের রিকশাচালক কপিয়ালের স্ত্রী।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার (৭ নভেম্বর) দিবাগত রাতে আদালতের পরোয়ানার (ওয়ারেন্ট) ভিত্তিতে আনোয়ারাকে নিজ বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে সোমবার (১০ নভেম্বর) সকালে জামিনে মুক্ত হন তিনি। কিস্তিতে ফ্রিজ কিনে জেলে যাওয়ার ঘটনা এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
চর বড়াইবাড়ি গ্রামে আনোয়ারা-কপিয়াল দম্পতির বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামীণ সড়কের পাশে খাস জমিতে টিনের ছোট্ট ঘরে তাদের বসবাস। আনোয়ারা জানান, দারিদ্র্য ঘোচাতে ২০২৩ সালে একটি দোকানঘর ভাড়া নিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করেন। দোকানে ঠান্ডা পানীয় ও নিত্যপণ্য রাখার জন্য কিস্তিতে ৩৯ হাজার টাকায় ওয়ালটনের একটি ফ্রিজ কেনেন। নিয়মিত কিস্তি দিচ্ছিলেনও, কিন্তু মেয়ের বিয়ের খরচের জন্য ঋণ করতে হওয়ায় কিস্তি পরিশোধে পিছিয়ে পড়েন। এদিকে ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে আয়ও বন্ধ হয়ে যায়।
তিনি বলেন, “ফ্রিজের কিস্তির ৩৪ হাজার টাকা দিয়েছি। কিন্তু সুদে-আসলে টাকাটা বেড়ে ৫৬ হাজারে দাঁড়ায়। আমরা মামলা হইছে সেটা জানতাম না। হঠাৎ রাতে পুলিশ এসে বলে, আমাকে থানায় যেতে হবে। ভয়ে শরীর কাঁপছিল। দুই দিন জেল খাটার পর স্বামী জামিন করায় মুক্তি পাই। এখনো ভাবি, একটা ফ্রিজ কিনে জেলে যেতে হবে, তা কল্পনাও করিনি।”
আনোয়ারার স্বামী কপিয়াল বলেন, “আমরা খাস জায়গায় থাকি। মামলার খবর পাইনি, কেউ নোটিশও দেয়নি। খবর শুনে ঢাকা থেকে ছুটে এসে উকিল ধরে বউকে জামিন করিয়েছি। আমরা গরিব মানুষ, কিস্তির টাকা দিতেই এমন বিপদে পড়লাম।”
স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক আমির হোসেন বলেন, “এরা হতদরিদ্র মানুষ। সামান্য কিস্তির জন্য একজন নারীকে এভাবে জেলে পাঠানো অমানবিক। সময় দিলে তারা টাকা পরিশোধ করত। বড় বড় ঋণখেলাপি ঘুরে বেড়ায়, কিন্তু গরিবের বেলায় আইন এত কঠিন কেন?”
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আনোয়ারা বেগম কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার ওয়ালটন শো-রুম থেকে ফ্রিজটি কিস্তিতে কেনেন। দুই বছর মেয়াদী কিস্তির ফ্রিজটির এখনও ২২ হাজার ২৭৫ টাকা বাকি রয়েছে। মামলার বাদী ও ওয়ালটনের শাখা ব্যবস্থাপক সাগর বলেন, “দুই মাস আগে মামলা হয়েছে, নোটিশ পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু তারা গ্রহণ করেননি। এখন তারা বাকি টাকা পরিশোধ করলে আমরা মামলা তুলে নেব।”
স্থানীয়ভাবে এই ঘটনাকে “সহজ কিস্তির কঠিন শাস্তি” হিসেবে দেখছেন গ্রামবাসী। তাদের প্রশ্ন—দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে কিস্তির নামে শৃঙ্খল বেঁধে মানুষের সম্মান কেড়ে নেওয়া কি ন্যায়সঙ্গত?