নানা আয়োজনে কুড়িগ্রামে হানাদার মুক্ত দিবস পালন
মো. আতিকুর রহমান, নাগেশ্বরী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৬:২০ পিএম
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গৌরবময় দিনগুলোর একটি ৬ ডিসেম্বর কুড়িগ্রাম হানাদার মুক্ত দিবস। যথাযোগ্য মর্যাদা ও নানা আয়োজনে দিনটি উদযাপন করেছে কুড়িগ্রামবাসী। শনিবার (৬ ডিসেম্বর) ভোর থেকেই জেলার বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজন করা হয় বিজয় শোভাযাত্রা, পুষ্পস্তবক অর্পণ, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি।
সকাল সাড়ে ৯টায় জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে জাতীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে দিবসের কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। পরে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ব্যানারে বিজয় শোভাযাত্রা বের হয়ে কলেজ মোড়, পুরাতন বাজার, কুড়িগ্রাম পৌর এলাকা প্রদক্ষিণ শেষে কলেজ মোড়স্থ স্বাধীনতার বিজয় স্তম্ভে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে শহীদদের স্মরণে পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন মুক্তিযোদ্ধা, জেলা প্রশাসন, সাংস্কৃতিক সংগঠন, মহিলা পরিষদ ও বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ।
পুষ্পমাল্য অর্পণ শেষে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা। এতে বক্তব্য রাখেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাসুদ রানা, বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আব্দুস সালাম, বীর প্রতীক আব্দুল হাই সরকার, জেলা কমান্ডার মোহাম্মদ নুরুজ্জামান, উপজেলা কমান্ডার আব্দুল বাতেন প্রমুখ।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাসুদ রানা বলেন, “কুড়িগ্রামের প্রতিটি ইঞ্চিতে মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তের স্মৃতি রয়েছে। এই দিবস আমাদের অস্তিত্বের স্মারক।”
বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আব্দুস সালাম বলেন, “১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর কুড়িগ্রাম ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের দুঃসাহসিক আক্রমণের ফল। আমরা সমন্বিত শক্তিতে পাক বাহিনীকে পরাস্ত করেছিলাম।”
বীর প্রতীক আব্দুল হাই সরকার বলেন, “আধুনিক অস্ত্র-সজ্জিত পাকিস্তানি সেনাদের মোকাবিলা করতে আমরা কেবল বিশ্বাস, দেশপ্রেম ও গেরিলা কৌশল ব্যবহার করেছি। তিস্তা–ধরলা নদীর চরাঞ্চল আমাদের শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছিল।”
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় কুড়িগ্রাম ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রণাঙ্গন। সীমান্তঘেঁষা জেলা হওয়ায় এখানে মুক্তিযোদ্ধারা সহজেই গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করতে পারতেন। ভারতের আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ লাগোয়া হওয়ায় প্রশিক্ষণ, অস্ত্র এবং রসদ সংগ্রহ সহজ হয়েছিল।
২৫ মার্চের গণহত্যার পর কুড়িগ্রামের তরুণরা দলবদ্ধ হয়ে ভারত সীমান্তে গিয়ে প্রশিক্ষণ নেয়। এরপর সেক্টর-৬ (লে. কর্নেল নাজমুল হক) এর অধীনে সংগঠিত হয় কুড়িগ্রাম অঞ্চল। সাব-সেক্টর স্থাপন করা হয় নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী, রৌমারী ও রাজীবপুর এলাকায়।
এপ্রিল-মে মাসে পাক সেনারা কুড়িগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় রাজাকার বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে দখলদারিত্ব শুরু করে। সদর, নাগেশ্বরী, ফুলবাড়ী ও উলিপুরে নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ ও গণহত্যার ঘটনা ঘটে। বহু মানুষ নদী তীরবর্তী চরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
রৌমারী–রাজীবপুরে শক্ত ঘাঁটি: ভারতসীমান্ত লাগোয়া হওয়ায় এই অঞ্চল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধান অপারেশনাল বেসে পরিণত হয়। এখান থেকে নদীপথে পাক বাহিনীর ওপর আকস্মিক আক্রমণ চালানো হতো।
নাগেশ্বরী–ভূরুঙ্গামারী ফ্রন্ট: এখানে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যাম্প গড়ে উঠেছিল। গেরিলারা বারবার পাক সেনাদের চৌকি ও রসদ পরিবহন লাইনে আক্রমণ করেন।
তিস্তা–ধরলা নদীপথের ব্যবহার: রাতের অন্ধকারে নৌকা ব্যবহার করে গেরিলারা ক্যাম্পে ঢুকে হামলা চালিয়ে নদীপথ দিয়ে দ্রুত ফিরে যেতেন।
ডিসেম্বরের শুরুতে ভারতীয় বাহিনী যুক্ত হলে পাক সেনাদের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে পাক বাহিনীর একাধিক ঘাঁটি দখল করে।
১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ভোরে মুক্তিযোদ্ধারা চারদিক থেকে কুড়িগ্রাম শহর ঘিরে ফেলেন। সকাল ৮টার পর তীব্র গোলাগুলিতে পাক সেনারা দিশেহারা হয়ে পড়ে। তাদের অনেকেই ধরলা নদীর দিক দিয়ে পালানোর চেষ্টা করলেও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়।
দুপুর নাগাদ কুড়িগ্রাম শহর পুরোপুরি মুক্ত হয়। শহরে উড়ানো হয় লাল-সবুজের পতাকা। মানুষ রাস্তায় নেমে “জয় বাংলা” স্লোগানে মুখরিত করে পুরো শহর।
জেলার বিভিন্ন উপজেলা প্রশাসনও পৃথকভাবে শোভাযাত্রা, পুষ্পার্পণ ও আলোচনা সভার আয়োজন করে। এবং দিনব্যাপী নানা আয়োজন দিবসটি পালিত হয়।