সন্তানেরা যুগ্মসচিব-বুয়েট শিক্ষক, তবুও একা ঘরে মরতে হলো বৃদ্ধা মাকে
মনোযোগ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬, ১১:১৬ পিএম
রাজধানীর মিরপুরে নিজ বাসা থেকে নুরজাহান বেগম (৭৫) নামে এক বৃদ্ধার পচাগলা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, মৃত্যুর অন্তত সাত থেকে আট দিন পর তার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
গত ৩১ মে রাতে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর পেয়ে মিরপুর-৬ এর সি ব্লকের ১৩ নম্বর সড়কের একটি ভবনের চতুর্থ তলার ফ্ল্যাট থেকে মরদেহটি উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাসান বাসির জানান, নুরজাহান বেগম তার মেয়ের সঙ্গে একই ফ্ল্যাটে থাকলেও আলাদা কক্ষে বসবাস করতেন। কয়েকদিন ধরে কোনো সাড়া না পেয়ে তার মেয়ে একজন নার্সকে ডাকেন। পরে ওই কক্ষে গিয়ে বৃদ্ধাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। এরপর পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
তিনি আরও জানান, মেয়ের সঙ্গে কথা বলে মৃত্যুর সময় ও পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এমনকি তিনি মায়ের মৃত্যুর সঠিক সময়ও বলতে পারেননি। এ কারণে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য, যে কক্ষে নুরজাহান বেগম থাকতেন সেটি ছিল অত্যন্ত অপরিচ্ছন্ন। কক্ষজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল বিভিন্ন ধরনের আবর্জনা। পরিবেশ দেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, দীর্ঘদিন ধরে তিনি প্রয়োজনীয় পরিচর্যা ও যত্ন থেকে বঞ্চিত ছিলেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নুরজাহান বেগমের তিন ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছেন। বড় ছেলে আনিসুর রহমান খুলনা সমুদ্র বন্দরে যুগ্মসচিব হিসেবে কর্মরত। মেজো ছেলে আশিকুর রহমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ছোট ছেলে আতিকুর রহমান কানাডা প্রবাসী। তার একমাত্র মেয়ে ফাতিমা নাসরিন সুলতানা।
জানা যায়, ফাতিমার স্বামী গোলাম সাকলাইন সাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। প্রায় পাঁচ বছর আগে তার মৃত্যু হলে ফাতিমা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তাদের কোনো সন্তান নেই।
মঙ্গলবার (২ জুন) সরেজমিনে ওই বাসায় গিয়ে দেখা যায়, ভবনের প্রধান ফটক ভেতর থেকে বন্ধ। ভবনের এক ভাড়াটিয়া জহির জানান, তিনি প্রায় চার বছর ধরে সেখানে বসবাস করছেন। প্রায় দেড় বছর আগে নুরজাহান বেগম মেয়ের বাসায় এসে থাকতে শুরু করেন। এরপর মা-মেয়ে একসঙ্গেই ছিলেন।
তার দাবি, নুরজাহানের সন্তানরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হলেও নিয়মিত মায়ের খোঁজখবর নিতে আসতেন না। মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে একজন ছেলে এলেও আরেকজন আসেননি বলে তিনি জানান।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এর আগে নুরজাহান বেগম তার মেজো ছেলে আশিকুর রহমানের আজিমপুরের পলাশি এলাকার বাসায় থাকতেন। পরে পারিবারিক নানা কারণে তিনি মেয়ের বাসায় চলে আসেন।
এ ঘটনায় ১ জুন পল্লবী থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করেন ফাতিমা নাসরিন সুলতানা। মামলায় তিনি উল্লেখ করেন, তার মা বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে মারা গেছেন এবং মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের কারও বিরুদ্ধে তার কোনো অভিযোগ বা সন্দেহ নেই।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক শামছুর রহমান বলেন, নুরজাহান বেগমের সন্তানরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হলেও তার শেষ জীবনের পরিস্থিতি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।