বাড়ছে লেদার ইঞ্জিনিয়ারের চাহিদা
মফস্বল সংবাদ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৪:৩৭ পিএম
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বৈশ্বিক বাজার প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালে এ অঙ্ক ৭৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করবে। এ বিশাল রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের হিস্যা ১ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার, যা শূন্য দশমিক ২৭ শতাংশের কাছাকাছি। তবে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি প্রতি বছর বাড়ছে। তাই দক্ষ লেদার ইঞ্জিনিয়ারের চাহিদাও বাড়ছে দ্রুতগতিতে। আপনি চাইলে এ বিষয়ে ক্যারিয়ার গড়তে পারেন।
কোথায় পড়বেন?
বাংলাদেশে বর্তমানে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে চামড়াশিল্প সংক্রান্ত বিষয় রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউটে লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং, ফুটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং ও লেদার প্রোডাক্টস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ‘ক’ ইউনিট থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। প্রতি বিভাগে আসন সংখ্যা ৫০টি। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে প্রতি বছর ৬০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়।
শিক্ষাগত যোগ্যতা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং ও টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং, ফুটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং ও লেদার প্রোডাক্টস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তির জন্য বিজ্ঞান ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। আবেদনের যোগ্যতা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক উভয় পরীক্ষায় ন্যূনতম ৩ দশমিক ৫ জিপিএসহ মোট জিপিএ ৮। কুয়েটে লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তির জন্য প্রার্থীকে চুয়েট, কুয়েট ও রুয়েটের স্নাতক পর্যায়ের সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হতে হবে। মাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগে ন্যূনতম জিপিএ ৪ এবং উচ্চমাধ্যমিকে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত ও ইংরেজি মিলিয়ে ন্যূনতম গ্রেড পয়েন্ট ১৮ হতে হবে।
কী পড়ানো হয়?
চামড়াশিল্পের পণ্যগুলো তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং, ফুটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং ও লেদার প্রোডাক্টস ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স খোলা হলেও তিনটি বিষয়ের পড়াশোনায় বেশ মিল রয়েছে। এখানে কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে শুরু করে উচ্চ মানসম্পন্ন চামড়াজাত পণ্য যেমন- জুতা, ব্যাগ উৎপাদনের জ্ঞান আহরণ করে শিক্ষার্থীরা। তত্ত্বীয় জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি হাতেকলমে শিক্ষালাভের জন্য রয়েছে সমৃদ্ধ কয়েকটি ল্যাব, যেমন- কম্পিউটার এইডেড ডিজাইন ল্যাব, লেদার ম্যানুফ্যাকচারিং ল্যাব, ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারিং ল্যাব, লেদার প্রোডাক্টস ম্যানুফ্যাকচারিং ল্যাব, ফিজিক্যাল টেস্টিং ল্যাব ইত্যাদি। বিশ্বমানের লেদার ইঞ্জিনিয়ার তৈরির জন্য পরিসংখ্যান, অর্থনীতি, ব্যবস্থাপনা, ব্যবসায় উদ্যোগ ইত্যাদিও পড়ানো হয়।
লেদার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে সম্ভাবনা
বাংলাদেশের চামড়াশিল্পের ঐতিহ্য ও বৈশ্বিক বাজারে চাহিদার কারণে এই খাতে কর্মসংস্থানের অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং এমন একটি বিষয় যেখানে চামড়া প্রক্রিয়াকরণ, উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনার শিক্ষার মাধ্যমে ভালো ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব। যেমন-
সরকারি চাকরি: বাংলাদেশে লেদার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে সরকারি খাতে চাকরির সুযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, যেমন- বাংলাদেশ লেদার রিসার্চ ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন (বিসিক), বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিজনেস প্রমোশন কাউন্সিলে লেদার ইঞ্জিনিয়ারদের চাকরির সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া এসএমই ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ শিল্প কারিগরি সহায়তা কেন্দ্র (বিটাক), বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি লিমিটেডে লেদার ইঞ্জিনিয়াররা কাজ করছেন। আবার প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসেও চাকরি করছেন অসংখ্য লেদার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে গ্র্যাজুয়েট।
বেসরকারি চাকরি: লেদার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ুয়াদের চাকরির সুযোগ বেশি মূলত বেসরকারি সেক্টরে। বাংলাদেশে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন- অ্যাপেক্স, বাটা, বে-এর মতো বড় বড় কোম্পানি লেদার ইঞ্জিনিয়ারদের নিয়োগ দিয়ে থাকে। এ ছাড়া ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও চামড়া প্রকৌশলীদের চাহিদা রয়েছে। এই খাতের কারখানাগুলোয় উৎপাদন ব্যবস্থাপনা, প্রক্রিয়াকরণ এবং মান নিয়ন্ত্রণের জন্য লেদার ইঞ্জিনিয়ারদের প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বায়িং হাউজগুলোতেও অনেক লেদার ইঞ্জিনিয়ারের কর্মসংস্থান হয়ে থাকে।
উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ: লেদার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে যারা উদ্যোক্তা হতে চান তাদের জন্যও অসংখ্য সুযোগ রয়েছে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা বিশ্বব্যাপী রয়েছে এবং বাংলাদেশে এই পণ্যের কাঁচামাল সহজলভ্য। যারা নিজেদের উদ্যোগে কারখানা স্থাপন করতে চান, তারা সহজেই চামড়া প্রক্রিয়াজাত, জুতা, ব্যাগ, বেল্ট ও অন্যান্য চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন করতে পারেন। উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন এবং উৎপাদন দক্ষতা থাকলে এই খাতে বিশাল ব্যবসায়িক সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও এই খাতকে সহায়তা করার জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা ও ঋণ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
উচ্চশিক্ষার অবারিত সুযোগ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কুয়েট উভয় প্রতিষ্ঠানে লেদার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এমএসসি কোর্স চালু রয়েছে। অনেকেই কর্মজীবনে গিয়ে হিউম্যান রিসোর্স, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি বিষয়ে এমবিএ করছে। ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্ট, প্রোডাকশন প্ল্যানিং ইত্যাদির ওপর এমএসসি/পিজিডি করছে কেউ কেউ। দেশের বাইরে ভারত, ইতালি, চীন, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে লেদার ইঞ্জিনিয়াররা উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে দেশে-বিদেশে চামড়া সেক্টরে অবদান রাখছে।
বেতন
রপ্তানিমুখী ট্যানারি ও জুতা ফ্যাক্টরিতে লেদার ইঞ্জিনিয়ারদের প্রাথমিক বেতন ২০-২৫ হাজার টাকা। অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে বেতন বৃদ্ধি পায়। তবে বহুজাতিক সোর্সিং প্রতিষ্ঠান ডেকাথলন, টিম্বারল্যান্ড, অ্যাডিডাস ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে প্রারম্ভিক বেতন আরও বেশি। বাংলাদেশ লেদার রিসার্চ ইনস্টিটিউটে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদে মূল বেতন ২২ হাজার টাকা। পাশাপাশি অন্যান্য সুবিধা রয়েছে।
সমস্যা
বাংলাদেশের চামড়াশিল্প, বিশেষ করে ট্যানারিগুলোর বিরুদ্ধে পরিবেশ দূষণের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (LWG)-এর পরিবেশ সনদ না থাকায় কিছু বায়ার বাংলাদেশে প্রক্রিয়াজাত চামড়ার ব্যাপারে অনীহা প্রদর্শন করছে। সে পরিপ্রেক্ষিতে চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রায়ই বিদেশ থেকে প্রক্রিয়াজাত চামড়া এনে জুতা, ব্যাগ ইত্যাদি তৈরি করতে হচ্ছে। এ সেক্টরের অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো প্রতিযোগিতামূলক বেতন কাঠামো অনুসরণ করছে না। পাশাপাশি কর্মঘণ্টা, কর্মপরিবেশ ইত্যাদি নিয়েও কিছু অভিযোগ শোনা যায়। তবে পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে। বিনিয়োগকারীরাও এখন অনেক সচেতন। ফলে লেদার ইঞ্জিনিয়ারদের সম্ভাবনা বরং উজ্জ্বলতর হচ্ছে।