অর্ধেকে নেমেছে সয়াবিন তেলের আমদানি, বাজারে বাড়ছে সংকট
মনোযোগ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১২:২৭ পিএম
দেশে সয়াবিন তেলের সরবরাহ সংকট দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে। আগে খুচরা দোকানগুলোতে সারি করে সাজানো থাকত বোতলজাত তেল, এখন সেখানে হাতে গোনা কয়েকটি বোতলই দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ডিলাররা অন্যান্য পণ্য নেওয়ার শর্তে তেল দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি খোলা তেল নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হওয়ায় ভোক্তাদের বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, সামনে কোরবানির ঈদ থাকায় ভোজ্য তেলের চাহিদা আরও বাড়বে। তাই দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একাধিক ব্যবসায়ী জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও দেশে সে অনুযায়ী সমন্বয় না হওয়ায় আমদানিতে আগ্রহ কমে গেছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে সয়াবিন তেলের আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গত বছরের একই সময়ে যেখানে আমদানি ছিল ৪ লাখ ৪৮ হাজার টন, সেখানে এ বছর তা নেমে এসেছে ২ লাখ ৬১ হাজার টনে। অর্থাৎ এক বছরে আমদানি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
অন্যদিকে একই সময়ে পাম তেলের আমদানি প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। গত বছর এ সময় ৪ লাখ ৫৯ হাজার টন পাম তেল আমদানি হলেও এ বছর তা দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৫৭ হাজার টনে। ফলে সয়াবিন তেলের ঘাটতি পাম তেল দিয়ে পূরণ হচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ বাণিজ্য ও শুল্ক কমিশনের তথ্য বলছে, দেশে বছরে প্রায় ২৪ লাখ টন ভোজ্য তেলের চাহিদা রয়েছে, যার প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানিনির্ভর। ফলে আমদানি কমে যাওয়ার প্রভাব সরাসরি বাজারে পড়ছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম সমন্বয় না হওয়ায় তারা লোকসানের মুখে পড়ছেন। দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও এখনো কার্যকর কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এতে আমদানি কমে গেছে।
একটি শীর্ষ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বলেন, এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চান না এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে বলেন। অন্য এক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেলের দাম বেশি থাকায় আমদানিতে চাপ বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারেও সয়াবিন তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী। জানুয়ারিতে প্রতি টন সয়াবিন তেলের দাম ছিল প্রায় ১ হাজার ১৫৪ ডলার, যা ফেব্রুয়ারিতে বেড়ে ১ হাজার ২৮২ ডলার এবং মার্চে ১ হাজার ৪৮২ ডলারে পৌঁছায়। এতে আমদানিকারকদের ব্যয় আরও বেড়েছে।
প্রায় দুই মাস ধরে দেশের বাজারে সয়াবিন তেলের সংকট চলছে। বিক্রেতারা বলছেন, রমজানের ঈদের আগ থেকেই সরবরাহে ঘাটতি ছিল, যার প্রভাব এখনো কাটেনি।
সরকারি বিপণন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৯৫ থেকে ২০০ টাকা এবং খোলা তেল ১৮২ থেকে ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খোলা পাম তেলের দাম ১৬১ থেকে ১৬৮ টাকা এবং সুপার পাম ১৬৫ থেকে ১৭২ টাকার মধ্যে রয়েছে। তবে বাজারে এর চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগও আছে।
ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা একটি সংগঠন জানিয়েছে, একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াচ্ছে। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত এক মানববন্ধনে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবীর ভূঁইয়া বলেন, বাজারে কার্যকর তদারকির অভাবে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
এদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। তিনি জানান, বোতলজাত তেলের সরবরাহ কিছুটা কম থাকলেও খোলা তেলের সরবরাহ রয়েছে এবং নির্ধারিত মূল্যের বাইরে বিক্রির বিষয়টি নজরদারিতে রাখা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বাজারে কোনো ধরনের কৃত্রিম সংকট বা কারসাজি সহ্য করা হবে না এবং কেউ বাজারকে জিম্মি করতে পারবে না।