দিল্লিতে তরুণদের বিক্ষোভে চাপে মোদি সরকার, দমননীতিও থামাতে পারছে না ক্ষোভ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৬ পিএম
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে হাজারো শিক্ষার্থী ও তরুণের বিক্ষোভ দেশটির রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। এ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তার সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যার-এ প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে, তরুণদের এই ক্ষোভই এখন মোদি সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিবন্ধে বলা হয়েছে, তরুণদের ক্ষোভের মুখে নরেন্দ্র মোদির সরকার কার্যকর কোনো রাজনৈতিক বার্তা দিতে পারেনি। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংলাপের উদ্যোগ নেওয়ার পরিবর্তে সরকার কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
লেখকের মতে, রাজনৈতিকভাবে মোদি সরকার এখন তুলনামূলক শক্ত অবস্থানে রয়েছে। মিত্রদের সমর্থন, বিরোধী শিবিরের দুর্বলতা এবং নির্বাচনী আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ (ডিলিমিটেশন) প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি সব মিলিয়ে ক্ষমতার ভারসাম্য সরকারের পক্ষেই রয়েছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সক্রিয় রয়েছেন নরেন্দ্র মোদি।
তবুও দিল্লির যন্তর মন্তরে হাজারো তরুণের সমাবেশ এবং সংসদ ভবনের দিকে পদযাত্রার ঘোষণার পর সরকারের কঠোর পদক্ষেপ নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ, অনশনরত সোনম ওয়াংচুককে হাসপাতালে নেওয়া এবং পরে আন্দোলনে যোগ দেওয়া রাহুল গান্ধীর সঙ্গে পুলিশের আচরণ নিয়ে সমালোচনা হয়েছে।
নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়, আন্দোলনকারীরা মূলত সরকারের জবাবদিহি দাবি করছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী চাইলে কোনো জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীকে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় পাঠাতে পারতেন। কিন্তু সেই উদ্যোগ দেখা যায়নি। বরং একই সময়ে তিনি তরুণ উদ্যোক্তাদের একটি রকেট উৎক্ষেপণের সাফল্যের প্রশংসা করেন এবং রাজনৈতিক বক্তব্যও দেন।
লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দিকে পেলেট গান তাক করার দৃশ্য দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অতীতেও নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) বিরোধী আন্দোলন এবং ২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলনের সময় দীর্ঘ আন্দোলনের মুখে সরকারকে নীতিগত পরিবর্তন আনতে হয়েছিল বলেও নিবন্ধে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান আন্দোলনের সূত্রপাত মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা নিট-সংক্রান্ত বিতর্ক এবং সোনম ওয়াংচুকের অনশনকে কেন্দ্র করে হলেও, পরে তা আরও বিস্তৃত অসন্তোষে রূপ নেয়। প্রশ্নফাঁস, শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা, দুর্নীতির অভিযোগ, বিভিন্ন অবকাঠামোগত ব্যর্থতা এবং শাসনব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভও আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে বলে মতামত নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিবন্ধে আরও বলা হয়, শুরুতেই যদি সরকার শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বসে সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিত, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। কিন্তু সরকারের উদাসীনতার কারণে আন্দোলন দিল্লি ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
লেখকের দাবি, সরকার প্রথমে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করলেও তা সফল হয়নি। পরে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অতিরিক্ত আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়। তবে এত কিছুর পরও আন্দোলনের গতি কমেনি।
মতামত নিবন্ধে বলা হয়েছে, পুরো পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নীরবতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে—এমন ধারণা সরকারের থাকতে পারে। তবে লেখকের মতে, তরুণদের পাশাপাশি তাদের পরিবার এবং একসময়কার সমর্থকদের মধ্যেও অসন্তোষ বাড়তে পারে।
নিবন্ধে আরও উল্লেখ করা হয়, অতীতে ভারতীয় জনতা পার্টি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বিভিন্ন আন্দোলনে সাংগঠনিকভাবে ভূমিকা রাখলেও, বর্তমান আন্দোলনটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে উঠেছে। এ কারণেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বলে লেখকের অভিমত।
উল্লেখ্য, এই মতামত নিবন্ধটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যার-এ লিখেছেন এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক সিদ্ধার্থ ভাটিয়া। এতে প্রকাশিত বিশ্লেষণ ও মতামত সম্পূর্ণভাবে লেখকের নিজস্ব।