৯ বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে বিএনপির ইশতেহার ঘোষণা
মনোযোগ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:৪৫ পিএম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে প্রায় দুই দশক পর রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কীভাবে দেশ পরিচালনা করবে- সে রূপরেখা জাতির সামনে তুলে ধরেছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ‘মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র’ গড়ার অঙ্গীকারে ৯টি প্রধান বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করা হয়েছে।
শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ের বলরুমে কোরআন তেলাওয়াত ও জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহার ঘোষণার অনুষ্ঠান শুরু হয়। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব রুহুল কবির রিজভী।
ইশতেহার প্রসঙ্গে বিএনপি জানিয়েছে, এটি কেবল একটি নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিপত্র নয়; বরং একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা। দলটির ভাষায়, প্রতিশোধের রাজনীতি নয়—ন্যায়, মানবিকতা ও জনগণের অধিকারই হবে তাদের রাজনীতির মূল ভিত্তি। ক্ষমতার লোভ নয়, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠাই বিএনপির রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু বলে ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়।
ইশতেহারে আরও বলা হয়, জনগণের রায়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে—যেখানে ভোটের মর্যাদা নিশ্চিত থাকবে, সন্ত্রাস ও দুর্নীতির অবসান ঘটবে, বৈষম্য দূর হবে এবং আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকবে না। প্রতিটি নাগরিক যেন গর্ব করে বলতে পারে—‘সবার আগে বাংলাদেশ’।
যে ৯ বিষয়ে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বিএনপি-
প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের মানুষের সুরক্ষা:
প্রান্তিক ও দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা বা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করা হবে। পর্যায়ক্রমে এই সহায়তার পরিমাণ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে।
কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি:
‘কৃষক কার্ড’-এর মাধ্যমে কৃষকদের জন্য ভর্তুকি, সহজ শর্তে ঋণ, কৃষি বীমা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় ফসল বাজারজাতকরণ জোরদার করা হবে। পাশাপাশি মৎস্যচাষী, পশুপালনকারী খামারি ও কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এই সুবিধার আওতায় আসবেন।
স্বাস্থ্যখাত সংস্কার:
দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা, মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা এবং রোগ প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি সম্প্রসারণের কথাও ইশতেহারে উল্লেখ রয়েছে।
শিক্ষাব্যবস্থা:
আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হবে। প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান এবং ‘মিড-ডে মিল’ চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
তরুণ ও কর্মসংস্থান:
তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
ক্রীড়া খাত:
ক্রীড়াকে পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ সুবিধা সম্প্রসারণ করা হবে।
পরিবেশ ও জলবায়ু:
পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন ও পুনঃখনন, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি:
ধর্মীয় সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ কর্মসূচি চালু করার কথা বলা হয়েছে।
ডিজিটাল অর্থনীতি:
ডিজিটাল অর্থনীতি জোরদারে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম (পেপাল) চালু, ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব গঠন এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।
ইশতেহার ঘোষণার আগে ও পরে আগামীর বাংলাদেশ নিয়ে দলের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও অঙ্গীকার তুলে ধরে ভিডিও উপস্থাপনাও করা হয়।
প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী বক্তব্যের একেবারে শেষে তারেক রহমান বলেন, নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারলে বিএনপির সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার থাকবে তিনটি বিষয়ে- দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। যে কোনো মূল্যে এই তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানান।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কূটনীতিক, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি এবং শরিক রাজনৈতিক দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-গবেষকরাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
এই নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারেক রহমান- এটাই তার প্রথম নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা। এর আগে পঞ্চম থেকে নবম সংসদ নির্বাচনে দলের ইশতেহার ঘোষণা করেছিলেন তৎকালীন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি কারাবন্দি থাকায় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইশতেহার ঘোষণা করেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত দশম ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন বিএনপি বর্জন করেছিল।