মাইলস্টোন বিমান দুর্ঘটনার এক বছর: সেই ভয়াল দিনের স্মৃতি তাড়া করে ফিরছে পরিবারগুলোকে
মনোযোগ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৭ এএম
রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে অবস্থিত মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে ৩৬ জনের প্রাণহানির মর্মান্তিক ঘটনার এক বছর পূর্ণ হলো আজ। তবে সময়ের ব্যবধানে কমেনি সেই দিনের ভয়াবহতার স্মৃতি। দুর্ঘটনা থেকে প্রাণে বেঁচে যাওয়া শিক্ষার্থী, তাদের পরিবার এবং নিহতদের স্বজনদের অনেকেই এখনো মানসিক আঘাত কাটিয়ে উঠতে পারেননি। আকাশে বিমান উড়তে দেখলেই কিংবা আগুনের দৃশ্য চোখে পড়লেই আতঙ্কে কেঁপে ওঠেন অনেকে।
গত বছরের ২১ জুলাই দুপুরে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজের হায়দার আলী ভবনে বিধ্বস্ত হলে মুহূর্তেই সেখানে নেমে আসে বিভীষিকা। ভয়াবহ আগুনে পুড়ে যায় ভবনের বিভিন্ন অংশ। ওই ঘটনায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবকসহ অন্তত ৩৬ জন প্রাণ হারান এবং শতাধিক মানুষ আহত হন। নিহতদের অধিকাংশই ছিল শিশু। দুর্ঘটনায় বিমানটির চালকও নিহত হন।
এক বছর পার হলেও সন্তান হারানোর শোক বয়ে বেড়াচ্ছেন অসংখ্য পরিবার। তাদের অভিযোগ, এত বড় দুর্ঘটনার পরও এখনো তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। এতে ক্ষোভ ও হতাশা আরও বেড়েছে।
নিহত শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদের বাবা রুবেল মিয়া বলেন, সকালে নিজ হাতে ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দিলেও দুপুরে তাকে নিথর দেহ হিসেবে ফিরে পান। এখন প্রতিদিন ছোট ছেলেকে স্কুলে নিয়ে এলেও শত শত শিক্ষার্থীর ভিড়ে বড় ছেলে তানভীরকে খুঁজে ফেরেন তিনি। সন্তানের শেষ হাসিমাখা মুখ আজও তার চোখে ভাসে।
নিহত সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহতাব রহমানের বাবা মিনহাজ রহমান জানান, এক বছর ধরে ছেলের পড়ার টেবিল ঠিক আগের মতোই সাজানো রয়েছে। বই-খাতা কেউ সরায়নি। প্রতিদিন মাহতাবের মা সেগুলো যত্ন করে পরিষ্কার করেন। একসময় প্রাণচঞ্চল তাদের ঘর এখন নিস্তব্ধতায় ভরা।
নিহত শিক্ষার্থী তাসনিম আফরোজ আয়মানের মা আয়েশা আক্তার বলেন, সরকারের দেওয়া ক্ষতিপূরণের অর্থ তারা গ্রহণ করেননি। তার ভাষায়, কোনো অর্থই সন্তানের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। তিনি বিদ্যালয়টি অন্যত্র স্থানান্তরের দাবি জানিয়ে বলেন, এখনো বিদ্যালয়ের ওপর দিয়ে বিমান চলাচল করায় শিক্ষার্থীরা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবার যেন এমন শোকের মুখোমুখি না হয়, সেটিই তার একমাত্র প্রত্যাশা।
দুর্ঘটনার পরও আবাসিক এলাকার ওপর দিয়ে প্রশিক্ষণ বিমান চলাচল অব্যাহত থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিভাবকেরা। তাদের অভিযোগ, আগের তুলনায় এখন আরও বেশি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, যা নতুন করে শঙ্কা তৈরি করছে।
তবে কলেজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পর ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ অংশ সংস্কার, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রস্তুত রাখতে নিয়মিত মহড়ার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
এদিকে, দুর্ঘটনার এক বছর পূর্তি উপলক্ষে দুই দিনের স্মরণ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজ কর্তৃপক্ষ। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে স্মরণসভা, দোয়া মাহফিল, কোরআনখানি, বিশেষ মোনাজাত, এক মিনিট নীরবতা পালন এবং নিহতদের প্রতি ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন।
এ ছাড়া দুর্ঘটনাস্থল আজ সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে। সেখানে নিহতদের ছবি, সহপাঠীদের স্মৃতিচারণ, বিভিন্ন বার্তা প্রদর্শন এবং স্বজনদের অংশগ্রহণে বিশেষ আয়োজন অনুষ্ঠিত হবে।