শুকনো পাতা দিয়ে যেভাবে তৈরী হয় মেসির পছন্দের পানীয় ইয়ারবা মাতে
খেলাধুলা ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬, ০৭:২৮ পিএম
বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা লিওনেল মেসির হাতে প্রায়ই দেখা যায় একটি ছোট কাপ ও ধাতব স্ট্র। সেটি কোনো কফি বা কোমল পানীয় নয়, বরং দক্ষিণ আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী পানীয় ‘ইয়ারবা মাতে’। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর এক হাতে ট্রফি ও অন্য হাতে ইয়ারবা মাতের কাপ নিয়ে মেসির সেই ছবি বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। এরপর থেকেই এই পানীয় সম্পর্কে ভক্তদের আগ্রহ বেড়েছে।
ইয়ারবা মাতে মূলত ক্যাফেইনসমৃদ্ধ একটি পানীয়, যা আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে ও ব্রাজিলের কিছু অঞ্চলে অত্যন্ত জনপ্রিয়। এসব দেশে এটি শুধু পানীয় নয়, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরিবার, বন্ধু কিংবা সহকর্মীদের সঙ্গে একই কাপ থেকে পালাক্রমে মাতে পান করা পারস্পরিক সম্পর্ক ও বন্ধনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিশেষ এক ধরনের গাছের শুকনো পাতা গরম পানিতে ভিজিয়ে ইয়ারবা মাতে তৈরি করা হয়। এর স্বাদে ঘাস, মাটির ঘ্রাণ এবং হালকা ধোঁয়াটে সুবাসের মিশেল থাকে। দক্ষিণ আমেরিকার মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এই পানীয় দীর্ঘদিন ধরেই জনপ্রিয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রেও ইয়ারবা মাতের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। অনেক দর্শক খেলা দেখতে যাওয়ার সময় সঙ্গে করে এই পানীয় নিয়ে যান। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলের ইয়ারবা মাতে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘ক্যাফে কোরাজন’-এর সহমালিক দুলসিনিয়া হেরেরা জানান, চাহিদা এতটাই বেড়েছে যে খুব দ্রুতই পণ্য শেষ হয়ে যাচ্ছে। অনেকেই নতুন অভিজ্ঞতার জন্য এটি কিনছেন, আবার আর্জেন্টিনা থেকে আসা অনেকের কাছে এটি নিজের দেশের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে।
শুধু মেসিই নন, উরুগুয়ের তারকা ফুটবলার লুইস সুয়ারেজসহ আরও অনেক ফুটবলারের হাতেও নিয়মিত দেখা যায় ইয়ারবা মাতে। বিশেষ করে বিশ্বকাপ জয়ের পর মেসির হাতে এই পানীয়ের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্বব্যাপী এর পরিচিতি আরও বেড়ে যায়।
ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানী এবং ‘দ্য বুক অব ইয়ারবা মাতে’-এর লেখক ক্রিস্টিন ফলচের মতে, বিভিন্ন দেশে ইয়ারবা মাতে পান করার ধরন ও পরিবেশনের পাত্র ভিন্ন হলেও তা সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।
বিশ শতকের শুরুতে সিরিয়া ও লেবাননেও ইয়ারবা মাতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক মুদি দোকানেও সহজেই শুকনো মাতে পাতা পাওয়া যায়। আবার দেশটির বাজারে এটি প্রাকৃতিক শক্তিবর্ধক পানীয় হিসেবেও বিক্রি করা হয়। অন্যদিকে জার্মানির বার্লিনে ‘ক্লাব মাতে’ নামে কার্বনেটেড একটি সংস্করণও বেশ জনপ্রিয়।
ঐতিহ্যগতভাবে ইয়ারবা মাতের পাতা ধোঁয়ায় শুকানো হয়। এ কারণে পানীয়টিতে বিশেষ ধরনের ধোঁয়াটে সুবাস তৈরি হয়, যা এর স্বতন্ত্র স্বাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অনেকের বিশ্বাস, এটি শরীরে সতেজতা ও কর্মশক্তি বাড়াতে সহায়ক।
বাংলাদেশে যেমন চায়ের কাপকে কেন্দ্র করে আড্ডা জমে ওঠে, ঠিক তেমনি আর্জেন্টিনায় সেই ভূমিকা পালন করে ইয়ারবা মাতে। একটি কাপ থেকে কয়েকজন মিলে পালাক্রমে পান করাই সেখানে স্বাভাবিক সামাজিক রীতি। ক্রিস্টিন ফলচের ভাষায়, কাউকে মাতে পান করার আমন্ত্রণ জানানো শুধু আপ্যায়ন নয়, বরং বন্ধুত্ব ও সম্পর্কের আন্তরিক প্রকাশ।
সূত্র: দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট।