ভারতের বিহারে মুসলিম নারীকে রোজা অবস্থায় খুঁটিতে বেঁধে গণপিটুনিতে হত্যা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ মার্চ ২০২৬, ০৯:০০ পিএম
ভারতের বিহারে ন্যায়বিচারের আশায় গ্রাম প্রধানের দ্বারে গিয়ে শেষ পর্যন্ত নির্মম মৃত্যুর শিকার হয়েছেন এক মুসলিম নারী। পবিত্র রমজানে রোজা থাকা অবস্থায় তাকে খুঁটিতে বেঁধে বেধড়ক মারধরের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয়দের বিরুদ্ধে। ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও শোকের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছে ভারতের বিহার রাজ্যের মধুবনী জেলার ঘোগারডিহা ব্লকের আমহি গ্রামে। ভুক্তভোগী রওশন খাতুন গত ১ মার্চ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এর আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি একদল লোকের হামলায় গুরুতর আহত হলে তাকে পাটনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, স্বামীর সঙ্গে জড়িত একটি স্থানীয় বিরোধ মেটাতে গ্রাম প্রধান কুমারী দেবীর কাছে সাহায্য চাইতে গিয়েছিলেন রওশন খাতুন। তবে অভিযোগ রয়েছে, সাহায্যের পরিবর্তে গ্রাম প্রধানের ছেলে মনু সিং এবং তার পরিবারের কয়েকজন সদস্যের নেতৃত্বে একদল লোক তার ওপর হামলা চালায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলাকারীরা রওশন খাতুনকে একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে বেধড়ক মারধর করে। তিনি বারবার হামলা বন্ধ করার অনুরোধ করলেও তা উপেক্ষা করা হয়। এ সময় তাকে অপমানজনক আচরণেরও শিকার হতে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, রওশন খাতুন ন্যায়বিচারের আশায় সেখানে গিয়েছিলেন। কিন্তু তার কথা শোনার পরিবর্তে কয়েকজন তাকে মারধর শুরু করে। পুরো ঘটনাটি গ্রামবাসীদের জন্য অত্যন্ত মর্মান্তিক ছিল।
আরেকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, অনেকেই ঘটনাটি দেখছিলেন, কিন্তু মারধর থামানো যায়নি। রওশন খাতুন বারবার তাদের থামতে বলছিলেন, কিন্তু কেউ কর্ণপাত করেনি।
স্থানীয় ডিজিটাল প্রকাশনা ‘মিথিলা সমাচার’ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা গেছে, হামলার সময় রওশন খাতুন রমজানের রোজা পালন করছিলেন। তিনি পানি চাইলে তাকে জোর করে মদ ও প্রস্রাব মেশানো পানীয় খাওয়ানো হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে পুলিশ জানিয়েছে, এই অভিযোগ এখনও পুরোপুরি যাচাই করা হয়নি।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ভুক্তভোগীর রোজা রাখা ও পানি চাওয়ার বিষয়ে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তবে বিষয়টি এখনও যাচাই-বাছাই চলছে এবং তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে রওশন খাতুনের স্বামী ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছেন। মনসুরি সম্প্রদায়ের রাজ্য সভাপতি অজয় মনসুরি জানিয়েছেন, নিহত নারীর ন্যায়বিচারের জন্য তারা শেষ পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
ঘটনার পর পুলিশ মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু করেছে। গ্রাম প্রধানের ছেলে মনু সিংকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সময় উপস্থিত অন্যান্য ব্যক্তিদেরও শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে এবং দোষী প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গ্রামে অতিরিক্ত নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। প্রমাণের ভিত্তিতে আরও গ্রেপ্তার হতে পারে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
রওশন খাতুনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো মধুবনী জেলায় শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও সমাজকর্মীরা বলছেন, গ্রামীণ এলাকায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
একজন প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, রওশন খাতুন একজন দরিদ্র নারী ছিলেন, যিনি কেবল সাহায্যের আশায় গিয়েছিলেন। তার মৃত্যু পুরো এলাকাকে নাড়া দিয়েছে। সবাই এখন তার জন্য ন্যায়বিচার দাবি করছেন।