শিগগিরই বাস্তবায়িত হচ্ছে নতুন পে-স্কেল
মনোযোগ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬, ১০:২৯ পিএম
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। ‘জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫’-এর সুপারিশ পর্যালোচনায় গঠিত কমিটি চলতি মাসের মধ্যেই তাদের চূড়ান্ত মতামত সরকারের কাছে জমা দিতে পারে। এরপর মন্ত্রিসভার অনুমোদনসহ প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে আগামী আগস্টের মধ্যে নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তবে নতুন বেতনকাঠামোর আর্থিক কার্যকারিতা ধরা হবে চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে।
অর্থ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন পে-স্কেল এক ধাপে কার্যকর হবে নাকি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে মন্ত্রিসভা। গেজেট প্রকাশ আগস্টে হলেও কার্যকারিতা পূর্ববর্তী তারিখ থেকে গণ্য করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন বেতনকাঠামোয় শুধু মূল বেতন নয়, বিভিন্ন ভাতার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াত ভাতাসহ বিভিন্ন সুবিধা পুনর্বিন্যাস করা হতে পারে। একই সঙ্গে কয়েকটি ভাতা একীভূত করা এবং বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন সুবিধা যুক্ত করার বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে।
এ ছাড়া পেনশন ও অবসর-সুবিধার কাঠামোতেও পরিবর্তনের আলোচনা চলছে। এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিধিবদ্ধ নিয়ন্ত্রক আদেশ (এসআরও) জারির প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। অর্থ বিভাগকে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় এসআরওর খসড়া তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনায় গঠিত কমিটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সচিব কমিটি এখন আর্থিক ও কারিগরি দিক যাচাই করছে। তাদের সুপারিশ মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের পর আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন এবং গেজেট প্রকাশের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর প্রতি বছর মূল বেতনে ৫ শতাংশ বার্ষিক বৃদ্ধি হলেও নতুন কোনো বেতনকাঠামো ঘোষণা করা হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ‘জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫’ গঠন করে। কমিশন চলতি বছরের জানুয়ারিতে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করে।
কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশে উন্নীত করা এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের যাতায়াত ভাতাসহ বিভিন্ন সুবিধা পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাবও রয়েছে।
এই সুপারিশ পর্যালোচনার জন্য গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদসচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির দায়িত্ব জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন-২০২৫ এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটি-২০২৫-এর সুপারিশ পরীক্ষা করে সরকারের জন্য চূড়ান্ত মতামত প্রদান করা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর দিকেই এবার সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সে কারণে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য তুলনামূলক বেশি বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ আসতে পারে। অন্যদিকে ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য হারে বেতন বাড়লেও তা তুলনামূলক কম হতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, ১ম থেকে ৯ম গ্রেডে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডে ৯০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির সুযোগ থাকতে পারে।
আন্তমন্ত্রণালয় কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশনের সমন্বয়ক নজরুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ ১১ বছর পর নতুন বেতনকাঠামো প্রণয়ন হওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে তারা শুধু মূল বেতন বৃদ্ধি নয়, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভাতা, পেনশন এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বাস্তবসম্মত সংস্কারও প্রত্যাশা করছেন।
নতুন পে-স্কেল কত ধাপে বাস্তবায়ন হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। শুরুতে তিন ধাপের পরিকল্পনা থাকলেও পরে দুই ধাপের বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য বছরে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। নতুন বেতনকাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে। এ অর্থের জোগান কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সে বিষয়েও মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০১৫ সালের পর এটিই হতে যাচ্ছে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য প্রথম পূর্ণাঙ্গ নতুন বেতনকাঠামো। মূল বেতন, ভাতা, পেনশন ও অবসর-সুবিধায় একসঙ্গে পরিবর্তন এলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ব্যবস্থায় এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংস্কার বাস্তবায়িত হবে।