জঙ্গল সলিমপুরে সেদিন হাত-পা বেঁধে উলঙ্গ করে দেড় ঘণ্টা পেটানো হয় নিহত র্যাব সদস্যকে
সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:৫১ এএম
চট্টগ্রাম নগর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ঘেরা সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে র্যাবের ওপর ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটেছে। দীর্ঘদিন ধরে ‘ছিন্নমূল জনপদ’ হিসেবে পরিচিত এই এলাকা নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর আধিপত্য রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত ১৯ জানুয়ারি বিকেলে ওই এলাকায় অভিযান চালাতে গিয়ে র্যাব–৭–এর ডিএডি আব্দুল মোতালেব (৪৫) নৃশংস গণপিটুনির শিকার হয়ে নিহত হন। একই ঘটনায় র্যাবের আরও দুই সদস্য ও একজন সোর্স গুরুতর আহত হন।
ঘটনার দুটি ভিডিও এবং ঘটনাস্থলে থাকা র্যাব সদস্যদের বর্ণনায় উঠে এসেছে ভয়াবহ নির্যাতনের চিত্র। ভিডিওতে দেখা যায়, একটি ঘরের ভেতর মোতালেবকে ফেলে রেখে অন্তত ৮–১০ জন একযোগে লাঠি দিয়ে মারধর করে। শুরুতেই তার পোশাক ছিঁড়ে হাত-পা বেঁধে তাকে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে ফেলা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী র্যাব সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমদিকে মোতালেব উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও প্রতিবারই আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। একপর্যায়ে তাকে টেনে কক্ষের একপাশে নিয়ে মাথা লক্ষ্য করে ধারাবাহিকভাবে আঘাত করা হয়। কেউ কাঁচা গাছের মোটা লাঠি ব্যবহার করে, আবার কেউ ইট-পাথর দিয়ে হাঁটু ও পায়ের আঙুলে চাপ দেয়। কক্ষের মেঝে রক্তে ভিজে যায়।
প্রথম দফা নির্যাতনের পর মোতালেবসহ চারজনকে একটি সিএনজি অটোরিকশায় করে তিন কিলোমিটার দূরের নিজামপুর এলাকায় নেওয়া হয়। সেখানে আরেকটি ঘরে শুরু হয় দ্বিতীয় দফা হামলা। ওই ঘরের দেয়াল ও মেঝেতেও রক্তের ছাপ দেখা গেছে। এ সময় ১৫–২০ জন হামলাকারী তাদের ওপর চড়াও হয়।
র্যাবের এক সদস্য জানান, দ্বিতীয় দফার শেষদিকে মোতালেব আর কথা বলতে পারছিলেন না, শুধু শ্বাস নিচ্ছিলেন। তার মাথা মারাত্মকভাবে থেঁতলে যায়। হামলাকারীদের আক্রমণ থামানোর কোনো লক্ষণ ছিল না।
একপর্যায়ে মোতালেবের শরীরে আর কোনো নড়াচড়া দেখা যায়নি। তবুও কয়েকজন হামলাকারী তার পায়ে কাঠ ও পাথর চাপ দিতে থাকে। পরে তাঁকে উল্টো করে শুইয়ে রাখা হয়। ভিডিওতে তার হৃদস্পন্দনের কোনো চিহ্ন দেখা যায় না।
একই ঘরে থাকা র্যাবের দুই সদস্য- নায়েক আরিফুল ও নায়েক এমাম হোসেনকেও দীর্ঘ সময় ধরে মারধর করা হয়। তাদের মাথা, কপাল, হাঁটু, পিঠ ও হাতে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। হামলার সময় হামলাকারীরা গালাগাল করতে থাকে এবং ‘আর কাউকে ছাড়বে না’ বলে চিৎকার করে। কয়েকজন পুরো ঘটনা মোবাইলে ভিডিও করে রাখে। হামলার শেষে কয়েকজন হামলাকারী নিজেরাই আহত র্যাব সদস্যদের মাথায় ব্যান্ডেজ জড়ানোর চেষ্টা করে।
র্যাব–৭–এর একাধিক কর্মকর্তা জানান, প্রায় দুই মাস ধরে জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা ছিল। রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের পর এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব বাড়ে। ঘটনার দিন সকালে একটি সোর্সের মাধ্যমে খবর আসে—এলাকায় একটি কার্যালয় উদ্বোধন হবে, যেখানে তিনজন আলোচিত সন্ত্রাসীর উপস্থিতির কথা ছিল। তাদের একজন ইয়াছিন।
বিকেল তিনটার দিকে র্যাব–৭–এর ১৬ সদস্যের একটি দল এলাকায় পৌঁছায়। সাড়ে তিনটার দিকে চার সদস্য কার্যালয়ের ভেতরে ঢুকে ইয়াছিনসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। হাতকড়া পরানোর সঙ্গে সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়, পরে লাঠি–সোঁটা ও ইটপাটকেল নিয়ে হামলা চালানো হয়। বাইরে থাকা র্যাব সদস্যরা ভেতরে ঢুকতে গেলে মাইকে ঘোষণা দিয়ে আরও লোক জড়ো করা হয়। একপর্যায়ে হামলাকারীর সংখ্যা তিন শতাধিক ছাড়িয়ে যায়।
সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহিনুল ইসলাম জানান, খবর পেয়ে পুলিশ তিন কিলোমিটার দূরের নিজামপুর এলাকা থেকে চার র্যাব সদস্যকে উদ্ধার করে। তাঁদের শরীরজুড়ে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। গুলির কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।