দু’মুঠো ভাতের লড়াইয়ে বৃদ্ধ বাবা, রশিই এখন তার শেষ সম্বল
নিজস্ব প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:০০ পিএম
কুঁচকানো চামড়া, তামাটে রঙের দাড়ি, আর চোখেমুখে হাজারো না-বলা কষ্টের ছাপ। বয়স তাকে ন্যুব্জ করলেও জীবনযুদ্ধের লড়াইয়ে তিনি এখনও হার মানেননি। রাজিবপুর বাজারের এক কোণে সামান্য কিছু রশি বিছিয়ে বসে আছেন বৃদ্ধ মকবুল হোসেন। যে বয়সে নাতি-নাতনিদের সঙ্গে আনন্দ-বেদনায় দিন কাটানোর কথা ছিল, সেই বয়সে দু'মুঠো অন্নের সংস্থানে তপ্ত রোদে ধুলোবালির মাঝে তাকে লড়তে হচ্ছে জীবনযুদ্ধে।
মকবুল হোসেনের বাড়ি কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলার বাউল পাড়া গ্রামে। সামাজিকভাবে তার পরিচয় তিনি একজন সফল বাবা ও দাদা হতে পারতেন। তার রয়েছে দুইজন স্বাবলম্বী ছেলে। শুধু তাই নয়, তার তিনজন নাতি বর্তমানে প্রবাসী, যাদের মধ্যে একজন থাকেন সিঙ্গাপুরে। অথচ ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! এত প্রাচুর্য আর বংশের প্রদীপদের সাফল্যের মাঝেও মকবুল হোসেন ও তার স্ত্রীর জায়গা হয়নি সন্তানদের ঘরে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ছেলেরা স্বাবলম্বী হওয়ার পর থেকেই বাবা-মায়ের প্রতি তাদের দায়িত্ব ভুলে গেছেন। এমনকি ছেলেদের কারণে আজ এই বৃদ্ধ বয়সেও স্বামী-স্ত্রীকে এক প্রকার বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করতে হচ্ছে। তারা বাবা-মায়ের খাবারের খরচ তো দেনই না, এমনকি বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় নূন্যতম চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতেও নারাজ। ছেলেদের এমন অমানবিক আচরণে আজ রাজিবপুর বাজারের রশি বিক্রি করাই হয়েছে মকবুল হোসেনের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।
চোখেমুখে চরম হতাশা, তবুও জীবনযুদ্ধ থেমে নেই। নিজের আর স্ত্রীর পেট চালাতে এই রশি বিক্রির সামান্য আয়টুকুই এখন তার কাছে পরম নির্ভরতা।
সমাজ যখন এগিয়ে যাচ্ছে, তখন মকবুল হোসেনের মতো বাবাদের এই করুণ পরিস্থিতি আমাদের মানবিকতাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে। যে নাতিরা প্রবাসে থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন, কিংবা যে ছেলেরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত, তাদের এই বিশাল অট্টালিকার ভিড়ে কি নিজের জন্মদাতার জন্য সামান্য একটু ভালোবাসার জায়গাও অবশিষ্ট নেই?
রাজিবপুর বাজারের এই দৃশ্যটি কেবল একজন বৃদ্ধের টিকে থাকার লড়াই নয়, বরং এটি আমাদের ক্ষয়িষ্ণু পারিবারিক মূল্যবোধের এক জীবন্ত দলিল। মকবুল হোসেনের এই দীর্ঘশ্বাস কি কখনো পৌঁছাবে তার সেই স্বাবলম্বী সন্তান কিংবা প্রবাসী নাতিদের কানে? উত্তরটা হয়তো সময়ের গহ্বরই বলে দেবে।